top of page

অমৃতকুণ্ড: বাংলার যোগ, বাংলার তাসাউফ

লখনৌতি ও বাংলার চিন্তার জগত

বাংলার ইতিহাসে লখনৌতির পরিচয় সাধারণত রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। অথচ ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতিকে পাঠ করলে দেখা যায়, সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি সেখানে গড়ে উঠছিল জ্ঞানচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ও রাজদরবারকে ঘিরে নবুয়তি প্রজ্ঞা, যুক্তিবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের নানা ধারা গড়ে উঠেছিল। এখানে এসেছিল রুকন উদ্দিন সমরকন্দী; বিকশিত হয়েছিল কাজী পরিবার। গবেষক আরিফ বিল্লাহ এই প্রবন্ধে লখনৌতির ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বাংলার ইলম ও হিকমাহর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ও যোগাযোগ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

লিখেছেন:

আরিফ বিল্লাহ

প্রকাশিত:

২ নভেম্বর, ২০২৬

আরিফ বিল্লাহ
​

১. ইলম ও হিকমার রাজধানী

আমরা কোনো নগর বা মানুষের আবাস করা একটা ভূখণ্ডকে কীভাবে চিন্তা করি? নগর কি শুধুমাত্র নির্মাণ করা কতগুলো দেওয়াল, দুর্গ বা প্রাসাদের সমষ্টি? নাকি তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীরতম কোনো আলেখ্য? যদি নগর কেবল ইট, পাথর ও পার্থিব ক্ষমতারই বিন্যাস হয়, তাহলে কোরআনে কেন বারবার আমাদের সতর্ক করে বলা হচ্ছে—‘দেখ আমি কত জনপদ ধ্বংস করে দিয়েছি’? এর মাধ্যমে আমরা কি বুঝি না যে, কোনো নগরকে তার কাঠামো দিয়ে রক্ষা করা যায় না, বরং তার অন্দরে প্রবাহিত নৈতিক ও রুহানি ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরও তার সুরক্ষা নির্ভর করে?

ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভ। গঙ্গা ও মহানন্দার পলিমাটি জড়ানো অববাহিকায় তখন এক নতুন সময়ের সূচনা ঘটছে। ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির অশ্বারোহীদের ক্ষুরের শব্দে সেদিন কেবল একটা রাজবংশের পতন ঘটে নাই। সেদিন এই বাঙ্গালা প্রবেশ করেছিল নতুন এক যুগে। তার সঙ্গে এল নতুন সত্য। এল নতুন জ্ঞানপরম্পরা। মানুষ ও সমাজকে নতুনভাবে চেনার এক অভূতপূর্ব পদ্ধতি তখন জন্ম নিচ্ছে। ১২০৪-০৫ খ্রিষ্টাব্দের ‘বঙ্গবিজয়’ আমরা সাধারণত সামরিক বিজয় বলে জানি। কিন্তু যুদ্ধের সেই ধুলোর আড়ালে ঘটে চলেছিল আরও গভীর এক রূপান্তর।

গৌড়-লক্ষ্মণাবতী— পরবর্তী মুসলিম ঐতিহাসিক সাহিত্যে যা ‘লখনৌতি’ নামে পরিচিত—হয়ে উঠল সেই রূপান্তরের কেন্দ্র। লখনৌতির হাত ধরেই বাঙ্গালার চিন্তার জগৎ প্রবেশ করল এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে।

‘লখনৌতি’ নামধাম সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য আমাদের হাতে নাই। কিন্তু তার সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, সেখান থেকে বলতে পারি– গৌড় নগর বিজয়ের পর মহারাজা লক্ষণসেনের নামানুসারে এখানে ‘লক্ষ্মণাবতী’ নামে একটি শহর গড়ে ওঠে। পুরাতন সূত্রের মধ্যে ‘মিনহাজ’ এই অঞ্চলকে একটি নির্দিষ্ট ‘রাজ্য’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। যার সীমানা খুব সম্ভবত মহানন্দা-করতোয়া-গঙ্গা নদীদ্বয়ের বেষ্টনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

এই লখনৌতি, এই নগর সম্পর্কেই এই লিখা। যার মধ্য দিয়ে নতুন এক সময়ের জ্ঞান ও চিন্তার ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের তাৎপর্য কেবল নতুন কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর মধ্য দিয়ে বাঙ্গালার পূর্ববিদ্যমান বৌদ্ধিক ভূগোলে জ্ঞান, কর্তৃত্ব এবং মানবজীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ঐতিহ্য গড়ে ওঠে।

স্থানীয় সামরিক উপাখ্যানগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গৌড়-লক্ষ্মণাবতী বা ‘লখনৌতি’ কেবল সামরিক নিরাপত্তার জন্য গড়ে ওঠা কোনো দূরবর্তী সীমান্ত চৌকি (Thugur) ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে এর একটা দ্বৈত অবস্থান ছিল। একদিকে এটি উত্তর ভারতের তুর্কি-ফারসি রাজনৈতিক বলয়ের পূর্বাঞ্চলীয় সম্প্রসারণের কেন্দ্র, অন্যদিকে প্রাচ্যদেশীয় বাঙ্গালার পূর্ববিদ্যমান সামাজিক ও বৌদ্ধিক জগতের মধ্যে নতুন একটি উপস্থিতির নিশান বহন করে আসছিল। ইসলাম এইখানে কেবল আরেকটি ঐতিহ্যগত ধারা বা প্রাচ্যদেশীয় প্রথা নয়, বরং এই ঐতিহ্যেরই অংশ হিসাবে নতুন দিশা ও হেদায়াত নিয়ে হাজির হয়েছিল। এই উপস্থিতির মধ্য দিয়েই ইতিহাসের এক নতুন যাত্রায় সে প্রবেশ করে। যার ভিত্তি ছিল নবুয়তি প্রজ্ঞা, খোদায়ি বিধান এবং যুক্তি-বুদ্ধির মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের দীর্ঘ দার্শনিক ইতিহাস।

লখনৌতিকে তাই কেবল নতুন এক শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসাবে দেখলে চলবে না। একে দেখতে হবে বাঙ্গালায় ‘ইলম’ (জ্ঞান) ও ‘হিকমাহ’র (প্রজ্ঞা) জগতে এক গভীর রূপান্তরের সূচনা হিসাবে।

এই রূপান্তর কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ঘটেছিল এশীয় ইতিহাসের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে। ড. আব্দুল করিম তার পিএইচডি থিসিস Social History of the Muslims in Bengal (Down to A.D. 1538) গ্রন্থে এই বিষয় খানিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান, মধ্য এশিয়া ও খোরাসানে মঙ্গোল আক্রমণের ধাক্কায় তখন বুখারা, সমরকন্দ, বলখ ও নিশাপুরের মতো প্রাচীন জ্ঞানকেন্দ্রগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সেই সময় প্রাণ বাঁচাতে এবং মেধা রক্ষা করতে বহু আলেম, ফকিহ, সুফি ও দার্শনিক অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছোটেন। সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল দিল্লি সালতানাত। লখনৌতিও ছিল উত্তর ভারতের এই বৃহত্তর ইসলামি জ্ঞান ও প্রশাসনিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও এই বিষয়ে সমকালীন সাক্ষ্য পাওয়া যায় না, তবুও আমরা বলতে পারি এই সংযোগ লখনৌতিকে নতুন এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য দান করেছিল।

লখনৌতির এই ঐতিহাসিক অবস্থান বুঝতে হলে প্রাচীন এথেন্সের সঙ্গে এর একটি তুলনামূলক বোঝাপড়ায় আসা যাক। এরিস্টটলের মতে, মানুষ স্বভাবতই এক রাজনৈতিক প্রাণী এবং ‘পলিস’ বা নগর গড়ে ওঠা মানুষের এক স্বাভাবিক নিয়তি। কিন্তু নবুয়তি ঐতিহ্য স্বভাবকে এই ধরনের প্রাকৃতিক ধারণার অধীন করে অনুমান করাকেই খণ্ডন করে। কারণ ‘নগর-সভ্যতা’ কেবল মানুষের স্বাভাবিক জৈবিক প্রয়োজনে গড়ে ওঠে না; বরং এইটা হলো তার প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠার বিপরীতে এক অতিপ্রাকৃতিক আকাংখা ও তার নিজের জন্য একটা পবিত্র ব্যবস্থা তৈয়ার করা। সভ্যতার শুরু থেকেই সকল সমাজই আদতে একটা ‘থিওক্রেটিক’ বা ধর্মীয় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেইখানে সামাজিক অনুক্রম বা ‘হায়ারার্কি’ কেবল ক্ষমতার বিন্যাস হিসাবে বোঝা হয় না। সব জায়গাতেই এই জিনিসটা সাধারণ— এগুলি সবই কেমন যেন একটা পবিত্র শৃঙ্খলার (sacred order) প্রকাশ।

এথেন্সের দর্শনের সারকথা হলো, সেইখানে মানুষের নৈর্ব্যক্তিক রূপ তার ভিতরে নয়, বরং বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়। সকল কুদামাদের (প্রাচীন দার্শনিক) মধ্যেই ঘুরেফিরে প্রায় একই প্রশ্ন উঠেছে, তারা প্রায় সবাই একই অনুসন্ধান অনুসরণ করেছেন যে, মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজের সঠিক সম্পর্কটি কেমন হবে। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল মানবীয় স্বভাব ও তার সুনির্দিষ্ট উৎকর্ষের নিরিখে ন্যায়, সদ্গুণ ও উত্তম জীবনের শর্ত খুঁজছিলেন। প্লেটোর দর্শনেও নগর ব্যাপারটা জীবনধারণের বস্তুগত প্রয়োজন পেরিয়ে মানুষের মুক্ত চেতনা ও প্রাচুর্যের পরিসর হিসাবে গড়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামি চিন্তায় এই রাজনৈতিক ও অস্তিত্বগত প্রশ্নটি উপস্থাপিত হয় একটা ভিন্ন ঐতিহাসিক ও দার্শনিক পরিসরে।

যদিও গ্রিক দর্শনের সঙ্গে মোলাকাতের মাধ্যমেই আল-কিন্দি, আল-ফারাবি কিংবা ইবনে সিনার সামনে এই প্রশ্ন প্রকট হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু তারা প্রশ্ন করলেন, যুক্তিবুদ্ধির অর্জিত সত্য আর ওহির মাধ্যমে আসা সত্যের সংযোগ কীভাবে ঘটবে? তারা একইসাথে ওহি, যা পুরানা ইট-পাথরের সভ্যতার বাইরে এক দুনিয়া ও এক খোদার ঘোষণা নিয়ে হাজির হয়, তার সঙ্গে গ্রিক সভ্যতার যুক্তিবুদ্ধির নৈর্ব্যক্তিক রূপের সংগে সংলাপ তৈরি করেন।

তারা দেখালেন, ‘নবুয়তি হিকমাহ’ ও ‘তাত্ত্বিক হিকমাহ’ বিপরীত দুইটা জিনিস নয়। নবুয়তি হিকমাহ মানে ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত অস্তিত্বগত ও নৈতিক সত্যের দিকনির্দেশ। অন্যদিকে তাত্ত্বিক হিকমাহ হলো পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও ধারণাগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য খোঁজার পদ্ধতিগত সাধনা। এই দুইয়ের সম্পর্ককের মধ্য দিয়েই ইসলামে দর্শনের নানান রূপ উন্মোচিত হয়েছে। কেননা ওহির ব্যাখ্যায় যেমন যুক্তিবুদ্ধির দরকার পড়ে, তেমনি তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আগেই নানারকমনৈতিক ও পরাবিদ্যাগত পূর্বানুমান সক্রিয় থাকে।

আল-ফারাবির ‘আল-মাদিনা আল-ফাদিলা’ বা সদ্গুণসম্পন্ন নগরের ধারণায় এর এক সুস্পষ্ট রূপ দেখা যায়। সেখানে রাজনৈতিক সমাজের মূল লক্ষ্য মানুষের পরম শুভ ও সুখ (তাহসিল-আসসাআদাহ) অর্জন। তিনি নবুয়ত, দর্শন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক দেখান। তাঁর মতে, দার্শনিক সত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধি আর নবুয়তি জ্ঞানের রূপক প্রকাশ— উভয়ই নগর তৈরিতে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে। উত্তম নগরের প্রশ্নটি তাই একান্তই শাসনকাজ চালানোর বিষয় নয়, এইখানে মানুষ সত্য, জ্ঞান ও আত্মিক পূর্ণতার মধ্য দিয়ে পরিবেষ্টিত হতে থাকে। অবশ্য আল-ফারাবির এই দর্শন লখনৌতির শাসকদের সরাসরি নীতি নির্দেশিকা ছিল— এমন দাবি করার ঐতিহাসিক সুযোগ নেই। কিন্তু এটি সেই বৃহত্তর ইসলামি ভাবদুনিয়ার অংশ, যা লখনৌতির চিন্তার পরিসরকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করে।

তাহলে আসল প্রশ্নটি দাঁড়ায়— কোন জিনিস একটা শহরকে ‘জ্ঞানের নগরী’তে পরিণত করে? কেবল কয়েকজন পণ্ডিতের সমাগম, কয়েকটি বইয়ের সংগ্রহ বা দর্শনের পাঠদানই কি তার জন্য যথেষ্ট? নাকি তার আসল শর্ত হলো এমন একটি জীবন্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর গড়ে ওঠা, যেখানে মানুষ কেবল খোদার বিধানকেই অনুধাবন করে না, বরং নিজের যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে সত্যের যাচাই করে এবং নিজের নৈতিক জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলো তোলে?

ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতিতে ঠিক এই পরিসর তৈরি হচ্ছিল। তবে লখনৌতি মোটেও এথেন্সের হুবহু অনুকরণ ছিল না; এথেন্সের মতো নতুন কোনো দার্শনিক ঘরানার জন্ম দেওয়াও এর লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু এথেন্স যেভাবে উত্তম জীবনের সঙ্গে জ্ঞানচর্চাকে যুক্ত করেছিল, লখনৌতি ইসলামি ভাববিশ্বের ভেতর দাঁড়িয়ে ওহি ও যুক্তির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সেই কাজটাই নতুন রূপে সাজিয়ে তুলছিল। লখনৌতি ছিল সেই বিশাল ঐতিহ্যের পূর্বাঞ্চলীয় এক প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার। এর আসল মহত্ব কোনো নতুন দর্শনের আবিষ্কারে নয়; বরং বাঙ্গালার সমকালীন ভূগোল ও রাজনীতিতে সেই প্রজ্ঞাকে নতুন পরিসরে স্থাপন করায়।

লখনৌতির ঐতিহাসিক সার্থকতা তাই এক নতুন বৌদ্ধিক পরিসরের সূচনায়। যার মধ্য দিয়ে নবুয়তি প্রজ্ঞা নিজের রূপ নিয়ে হাজির হয়েছিল বাঙ্গালার জ্ঞান ও সাধনার বিভিন্ন ধারায়। যা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে নাই, বরং দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সুতরাং লখনৌতির ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রধান কাজ হওয়া উচিত— ত্রয়োদশ শতকে এই নদীময় ভূখণ্ডের চিন্তার জগতে কীভাবে এক নতুন পরিস্থিতির উদয় হয়েছিল তা অনুধাবন করা। নবুয়তি প্রজ্ঞা, বৌদ্ধিক বিচার এবং আধ্যাত্মিক চর্চা কীভাবে সেই নতুন সামাজিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল, তা সন্ধান করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার। এই অনুসন্ধানের মাধ্যমেই আমরা লখনৌতির রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি বাঙ্গালায় ইসলামি ‘ইলম’ ও ‘হিকমাহ’র বিকাশকে গভীরভাবে বুঝতে পারব।

২. মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসা

লখনৌতির শিক্ষাব্যবস্থার ভিত মূলত রচিত হয়েছিল খলজি শাসকদের হাত ধরে। রাজনৈতিক ক্ষমতা থিতু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন শাসকগোষ্ঠীর সামনে অনিবার্য হয়ে ওঠে প্রশাসনিক, বিচারিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার তাগিদ। আর এই প্রয়োজনের তাগিদেই মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণের বিষয়টি পেয়েছিল বিশেষ গুরুত্ব।

বাংলার গভর্নর গিয়াস উদ্দীন ইওয়াজ খিলজির মুদ্রা
বাংলার গভর্নর গিয়াস উদ্দীন ইওয়াজ খিলজির মুদ্রা

সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ জুজজানি তাঁর তবাকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে বখতিয়ার খলজির উদ্যোগে মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজির আমলেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং আলেম সমাজের পৃষ্ঠপোষকতার ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সংখ্যা, সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম বা অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সেকালের তথ্য বেশ সীমিত, তবুও সেগুলোর উপস্থিতি লখনৌতির মাটিতে জ্ঞানচর্চার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠার কথাই জোরালোভাবে নির্দেশ করে।

মধ্যযুগীয় সমাজে মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। মসজিদ কেবল ইবাদতের জায়গা ছিল না, বরং তা ছিল পাঠদান, উপদেশ গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগের এক প্রাণবন্ত পরিসর। মক্তব যুক্ত ছিল প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে, আর মাদ্রাসা বিকশিত হয়েছিল উচ্চতর ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসাবে। তা ছাড়া, শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠচক্র এবং ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যপরম্পরাও জ্ঞানচর্চাকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষার বাহন হিসাবে বিবেচনা করলে তাদের ঐতিহাসিক কার্যকারিতা পুরাপুরি বোঝা যায় না। নতুন একটা রাজনৈতিক সমাজে আইনগত বিরোধ নিষ্পত্তি, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের বিধান, প্রশাসনিক নথিপত্র, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং সামাজিক সম্পর্ক সংগঠনের জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষিত ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল। ফকিহ, কাজী, শিক্ষক ও ধর্মীয় পণ্ডিতরা সেই প্রয়োজনের বিভিন্ন অংশ পূরণ করতেন।

এখানে তাদের সমস্ত জ্ঞানচর্চারই একটা প্রত্যক্ষ ব্যবহারিক ও সামাজিক দিক ছিল। নবুওয়াতি প্রজ্ঞার তাগিদই হলো, কোনো জ্ঞানই আর কখনো কোনো বিমূর্ত সত্যের অন্বেষণ হয়ে থাকতে পারবে না। নবীজি তাই একইসাথে সমাজ পরিচালনা ও শাসন, বিধানের ব্যাখ্যা ও বয়ান এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করেছেন।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও জ্ঞানচর্চা

লখনৌতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে আলেম, সুফি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি, অর্থ এবং অন্যান্য সম্পদ বরাদ্দের বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ওয়াকফ, ইদরার, ওয়াজিফা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পরিভাষায় মদদ-ই-মাআশ এসব ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন রূপ নির্দেশ করে।

তবে ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতিতে পরবর্তী মুঘল যুগের সুসংগঠিত মদদ-ই-মাআশ ব্যবস্থা একই রূপে বিদ্যমান ছিল বলে ধরে নেওয়া যায় না। একইভাবে রাজকীয় অনুদান, নিষ্কর ভূমি এবং ওয়াকফকে অভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করাও ভুল। ওয়াকফ সাধারণত নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে উৎসর্গীকৃত সম্পত্তি, অন্যদিকে শাসকের রাজস্ব-অনুদান ভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থার অধীন।

মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর তবকাত-ই-নাসিরি গ্রন্থে সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজির পক্ষ থেকে আলেমদের বৃত্তি প্রদান এবং তাঁর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক মাসুমি এই বিবরণের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক নরেন্দ্রনাথ ল (N. N. Law) এর Promotion of Learning in India during Muhammadan Rule গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি টেনে উল্লেখ করেন, বাঙ্গালার শাসনভার গ্রহণের পর ইওয়াজ খলজি লখনৌতিতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও সরাইখানা নির্মাণ করেছিলেন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের জীবিকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত বিকাশেও ভূমিকা রাখছিল।

দারাস বাড়ী মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসা ঢিবি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
দারাস বাড়ী মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসা ঢিবি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

মাসুমি আরো লিখেন, লখনৌতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো দারসবাড়ি। নরেন্দ্রনাথ ল-এর বরাতে বলেন, গৌড়ের উমরপুর গ্রামের নিকটবর্তী, মহদীপুর ও ফিরোজপুরের মধ্যবর্তী একটি স্থানের উল্লেখ করেছেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘দারসবাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। নামটির সঙ্গে পাঠদান বা মাদ্রাসার সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি অনুমান করেন। ওই স্থানে দারসবাড়ি মসজিদ নামে পরিচিত একটি মসজিদের অস্তিত্বও রয়েছে। সেখানে প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে ৮৮৪ হিজরি বা ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের আমলে মসজিদ নির্মাণের উল্লেখ পাওয়া যায়। শিলালিপিটি দারসবাড়ি মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল বলে ধরে নিয়ে ল অনুমান করেন যে, মাদ্রাসাটি হয় মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, নয়তো কাছাকাছি পৃথক ভবনে অবস্থিত ছিল। তবে এই নামের ব্যুৎপত্তি এবং মসজিদের শিলালিপি থেকে মাদ্রাসার নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাকাল নিশ্চিত করা যায় না। বিশেষত পঞ্চদশ শতকের এই নিদর্শনকে ত্রয়োদশ শতকের ইওয়াজ খলজির নির্মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

এই সাক্ষ্যগুলো একত্রে বিবেচনা করলে লখনৌতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশের একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শনাক্ত করা যায়। ত্রয়োদশ শতকে ইওয়াজ খলজির পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিবরণ সেই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে ধারণা দেয়। অন্যদিকে দারসবাড়ির মতো পরবর্তী নিদর্শন গৌড়-লখনৌতি অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষা ও স্থাপত্যের প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতা অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করে। এখানে জ্ঞানচর্চার অর্থনৈতিক ভিত্তি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হয়ে উঠছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণে শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা একটি স্বীকৃত ভূমিকা লাভ করেছিল। এর ফলে পাণ্ডিত্যচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত ও সামাজিক শর্ত তৈরি হতে পারত, যদিও সেই পৃষ্ঠপোষকতার পরিমাণ, স্থায়িত্ব এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট দলিল প্রয়োজন।

পাঠ্যক্রম: মানতিক, কালাম, ফিকহ ও ভাষাতত্ত্ব

লখনৌতির মাদ্রাসাগুলোর নির্দিষ্ট পাঠ্যতালিকা আমাদের হাতে নাই। তবে ত্রয়োদশ শতকের বৃহত্তর ইসলামি শিক্ষাজগতে যে শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল, তার আলোকে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বৌদ্ধিক পরিসর অনুধাবন করা যায়।

মানতিক বা যুক্তিবিদ্যা ইসলামি শিক্ষাপদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। এইখানে ধারণা, সংজ্ঞা, বিচার, অনুমান এবং যুক্তির বৈধতা বিশ্লেষণ করা হয়। এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যার আরবি রূপান্তর ও পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আল-ফারাবি, ইবনে সিনা এবং পরবর্তী চিন্তাবিদরা এই শাস্ত্রকে বিকশিত করেছিলেন। বিশেষত তাসাওউর (ধারণাগত উপলব্ধি) ও তাসদিক (বিচারমূলক স্বীকৃতি), হদ্দ (সংজ্ঞা) এবং কিয়াস (যুক্তিগত অনুমান) জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

কালাম বা যৌক্তিক ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলি, জগতের সৃষ্টি, কার্যকারণ, মানবীয় ইচ্ছা এবং প্রত্যাদেশের সত্যতা নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা গড়ে ওঠে। আশআরি ও মাতুরিদি ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্র সামাজিক ও বিচারিক জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত ছিল। উত্তর ভারতীয় মুসলিম শাসনব্যবস্থায় হানাফি আইনশাস্ত্রের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বাঙ্গালার মুসলিম বিচারিক সংস্কৃতির ইতিহাসেও এই ঐতিহ্য প্রাসঙ্গিক। বুরহানউদ্দিন আল-মারগিনানির আল-হিদায়াহ, তাজুশ শরীয়াহর বেকায়া ও নেকায়া কিতাবগুলি বাঙ্গালার পরবর্তীকালের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠদান করানো হোত।

আরবি ভাষাতত্ত্ব ও বালাগাত ধর্মীয় পাঠের অর্থ নির্ধারণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করত। কোনো শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ, সাধারণ ও বিশেষ ধারণা, বাক্যের গঠন এবং অর্থের সম্ভাব্যতা নির্ধারণের প্রশ্ন আইনশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

এই শাস্ত্রগুলোর জ্ঞান ও ভাষার প্রশ্নের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এর মধ্যে প্রথমেই এই প্রশ্ন করা হয়, কোনো বক্তব্যের অর্থ কীভাবে নির্ধারিত হয়? একটি সিদ্ধান্ত কোন ধরনের অনুমান ও প্রতীজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত? যুক্তির কাঠামো বৈধ হলেও তার পূর্বানুমান সত্য কিনা? ভাষাগত অস্পষ্টতা কীভাবে বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে?

মধ্যযুগে জ্ঞান ও ভাষার বিচারে এই চর্চার যে শাস্ত্রীয় কাঠামো গড়ে উঠেছে তা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের যে বৈপ্লবিক রূপান্তর তা নাকচ করে না। বরং উভয় ঐতিহ্যের মধ্যে যুক্তির গঠন, ধারণার স্পষ্টতা এবং প্রমাণের বৈধতা নিয়ে তুলনামূলক অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করে।

এখানে আরও একটি কালগত সংশোধন প্রয়োজন। পরবর্তী উপমহাদেশে সুপরিচিত দরস-ই-নিজামি পাঠক্রম অষ্টাদশ শতকে মোল্লা নিজামউদ্দিন সিহালভির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতির শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি দরস-ই-নিজামির প্রাথমিক সংস্করণ বলা যথার্থ নয়। বরং এই সময়ে বাঙ্গালার সঙ্গে সেই বৃহত্তর ইসলামি শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছিল, যার কিছু উপাদান পরবর্তী যুগের পাঠক্রমে আরও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।

৩. দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক: সংলাপে ‘মজলিস’

ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতিতে ‘মজলিস’ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। মজলিস বলতে আমরা রাজা-বাদশাহদের প্রমোদ বা আনুষ্ঠানিক দরবার বুঝবো না। বরং এটা এমনই এক দরবার যেখানে জ্ঞান ও ক্ষমতার কর্তৃত্ব পরস্পরের মুখোমুখি হয়। মধ্যযুগের মুসলিম জনপদগুলিতে মজলিস বলতে শাসকের সভা, শিক্ষকের পাঠচক্র কিংবা আলেম ও পণ্ডিতদের তাত্ত্বিক বিতর্কের সমাবেশকে বোঝানো হতো। তবে লখনৌতির চিন্তার পরিসরে এই মজলিসের তাৎপর্য আরও বহুমাত্রিক।

মিনহাজ-ই-সিরাজের তবাকাত-ই-নাসিরী থেকে আমরা জানতে পারি, সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজির দরবারে নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনা বা ‘তাজকির’ আসর বসত। সেখানে গজনি থেকে আগত পন্ডিত জালালউদ্দিন ইবনে জামালউদ্দিনের মতো বিদ্বান ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখতেন। রাজদরবারে এমন সব পন্ডিতদের উপস্থিতি কেবল ক্ষমতার আড়ম্বর প্রকাশ করত না, বরং এটি প্রমাণ করত যে লখনৌতির নতুন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিজেকে কেবল তরবারির জোরে টিকিয়ে রাখতে চায়নি; বরং ইলম ও বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয়ের মাধ্যমে সে নিজের বৈধতা খুঁজছিল।

লখনৌতির এই বৌদ্ধিক পরিসর কতটা বিস্তৃত ও প্রভাবশালী ছিল, তার হদিস পাওয়া যায় ঐতিহাসিকদের মধ্যেও। সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে খোদ মিনহাজ-ই-সিরাজ জুজজানির নিজের জীবন ও লখনৌতিতে বাসের বয়ানে। ৬৪০ হিজরির ৯ রজব তিনি দিল্লি থেকে বাঙ্গালার উদ্দেশে রওনা হন এবং একই বছরের ৭ জিলহজ লখনৌতিতে এসে পৌঁছান। সেখানকার গভর্নর ইজ্জউদ্দিন তুঘান খান তাঁকে অত্যন্ত সমাদর করেন এবং তিনি প্রায় দুই বছর সেই জনপদে কাটিয়ে দেন। মিনহাজের এই উপস্থিতি উত্তর ভারত এবং বাঙ্গালার উদীয়মান রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও পরিশীলিত পাণ্ডিত্যের মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগের বাস্তব দলিল।

মিনহাজ নিজে একজন কাজী, ধর্মীয় শিক্ষক, খতিব ও ইতিহাসলেখক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে লখনৌতি ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যাওয়ার পর তিনি দিল্লির বিখ্যাত নাসিরিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং ওয়াকফের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। এমনকি তিনি গোয়ালিয়রের কাজী এবং দিল্লির জামে মসজিদের খতিবের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তাঁর এই বর্ণাঢ্য জীবন প্রমাণ করে যে, সেকালের আলেম ও কাজীরা কেবল সংকীর্ণ ধর্মীয় গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বিচারকার্য, শিক্ষাব্যবস্থা, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং একইসাথে শাস্ত্রীয় চর্চা— সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল একই পরিসরে।

বাঙ্গালার এই জনপদে প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনশাস্ত্রের কোনো একাডেমি ছিল কিনা আমরা জানি না। থাকার দরকারও নাই। কিন্তু লখনৌতি যুক্ত ছিল এক বিশাল ও সুদূরপ্রসারী জ্ঞানগত দুনিয়ার সঙ্গে। খোরাসান, মধ্য এশিয়া কিংবা দিল্লির কেন্দ্র থেকে আলেম, কাজী ও সুফিদের যে অবিরাম যাতায়াত শুরু হয়েছিল, তা একটা জগতকে নতুনভাবে বিন্যাস দিয়েছে এবং গড়ে তুলেছে ‘বঙ্গীয় বদ্বীপ’। ঐতিহাসিকভাবে এটি ছিল ইসলামের বিশ্বজাগতিক ভাবধারার পূর্বাঞ্চলীয় বিস্তার। মধ্য এশিয়ার বুখারা বা নিশাপুরের প্রাচীন জ্ঞানকেন্দ্রগুলো যখন মঙ্গোলদের ধ্বংসযজ্ঞে বিপর্যস্ত, তখন সেই জ্ঞানের ধারা লখনৌতির পলিমাটিতে এসে নতুন এক রূপ লাভ করছিল।

শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার লেখা নাম-ই হক এর প্রচ্ছদ। ছবি: রেখ��তা
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার লেখা নাম-ই হক এর প্রচ্ছদ। ছবি: রেখতা

এই সংযোগের শেকড় অনেক গভীর। সুলতানি আমলের শুরু থেকেই খোরাসান, ফারসি এবং মধ্য এশিয়ার মনীষীরা বাঙ্গালার জনপদে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছিলেন। যেমন, বখতিয়ার খলজির সঙ্গেই বাঙ্গালায় এসেছিলেন বাবা কোতোয়াল ইসপাহানির মতো ফারসি-ইরানি সংযোগের মানুষেরা, কিংবা পরবর্তী সময়ে কাজী রুকনউদ্দিন সমরকন্দী ও শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামার মতো পন্ডিতেরা। আবু তাওয়ামাকে এখন আমরা সবাই কমবেশি চিনি। তিনি বাঙ্গালায় হাদিস ও ফিকহের মসনদ গড়ে তুলে আসাম, বিহার থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙ্গালাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার শিষ্য পরম্পরায় রয়েছেন, শায়খ শরফুদ্দিন আহমেদ বিন ইয়াহইয়া মানেরী ও মুজাফফর শামস বলখী। অন্যদিকে রুকনউদ্দিন সমরকন্দী একইসঙ্গে একজন সুফি ও হানাফি ফকিহ ছিলেন। লখনৌতিতে অবস্থানকালে কামরূপের এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেই ব্রাহ্মণের নাম ছিল ভোজর ব্রাহ্মণ, যিনি ছিলেন যোগসাধনার পন্ডিত। সেই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে যোগ এবং সুফি সাধনার আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মধ্যে তখন এক সংলাপ তৈরি হয়। সমরকন্দী মহাশয় এই ব্রাহ্মণের সঙ্গে আলাপ করে যেভাবে প্রভাবিত হোন, একইসঙ্গে ভোজর ব্রাহ্মণ ইসলামের প্রভাবে অভিভূত হয়ে ধর্মগ্রহণ করেন এবং নিজের যোগসাধনার সংস্কৃত গ্রন্থ অমৃতকুণ্ড কাজীর হাতে তুলে দেন। কাজী রুকনউদ্দিন সেই গ্রন্থটিকে প্রথমে আরবিতে হওজ আল-হায়াত নামে এবং পরে ফারসিতে অনুবাদ করেন।

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে লখনৌতির মজলিস বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর কেবল মধ্য এশিয়ার জ্ঞানকে অবিকল আমদানি করছিল না। বরং বাঙ্গালার স্থানীয় ভাবদর্শন, যোগসাধনা এবং ইসলামি শরিয়ত ও তাসাউউফের ভাবনা সেখানে একে অপরের সঙ্গে সংলাপ ও পর্যালোচনায় লিপ্ত হয়। এই সকল বিষয়ও পরবর্তীতে বিশেষত সুফি তরিকাগুলির বিভিন্ন ধারায় নানারকম সংস্কার ও অদল-বদলের মধ্য দিয়ে গৃহীত হয়। কাজেই কাজী, আলেম এবং সুফি সাধকদের এই নিরন্তর যাতায়াত ও আলোচনা বাঙ্গালার চিন্তার জগতকে কীভাবে প্রভাবিত ও বিকশিত করেছে, তার অনুসন্ধান ছাড়া বাঙ্গালা ও তার চিন্তার রূপটি খুঁজে পাওয়া অসম্ভবই বটে।

৪. রহস্যবাদী জ্ঞানতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: সুফি খানকাহ ও স্থানীয় ভাবধারা

লখনৌতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কেবল মাদ্রাসার চার দেওয়াল কিংবা ফকিহ ও কাজীদের আইনি বিতর্কের পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সমান্তরালে বিকশিত হয়েছিল নানারকম আধ্যাত্মিক-জ্ঞানগত ধারা। খানকাহ, শিক্ষক ও শিষ্যের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ক এবং অন্তিক সাধনার পরিসর ছিল এই ধারার প্রাণকেন্দ্র। মাদ্রাসা ও খানকাহকে জাহেরি শরিয়ত ও বাতেনি শরীয়তের দুইটা পরস্পরবিরোধী ধারা হিসাবে দেখা ঐতিহাসিক সত্যের বরখেলাপ হবে।

বাঙ্গালার বহু সুফি নিজেই ছিলেন শাস্ত্রীয় জ্ঞানে গভীর অর্থে পন্ডিত। তাঁরা শরিয়ত, তরিকত এবং বাস্তব জীবনের নান্দনিক অনুশীলনের মধ্যে একটি সুষম মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন। তাদের খানকাহের একটা স্বতন্ত্র জ্ঞানতাত্ত্বিক চরিত্রও আছে। খানকাহে যেই জ্ঞান স্রেফ বিমূর্ত বুদ্ধির খেলা হয়ে থাকে, তা থোড়াই কেয়ার করা হোত। বিপরীতে তারা নৈতিক অনুশীলন, আত্মশুদ্ধি বা ‘তাজকিয়া’ বা আল্লাহর স্মরণ, গভীর মনোযোগ এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান ও বুদ্ধিকে জীবন ও জগতের মধ্যে সক্রিয় করে তোলার কাজ করে।

ইসলামি জ্ঞানের জগতে আমরা সাধারণভাবে জ্ঞান বলতে নানা শব্দ ব্যবহার করি। যেমন, ‘ইলম’, ‘মারিফা’, ‘আকল’ এবং ‘কাশফ’। এর মধ্যে একটা আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। ‘ইলম’ হলো বাহ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের জগৎ। ‘মারিফা’ হলো অন্তরের ভেতর থেকে চেনার ও উপলব্ধির জগৎ। ‘আকল’ নির্দেশ করে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুধাবনের ক্ষমতা। আর ‘কাশফ’ হলো পরিভাষায় আত্মিক উন্মোচন ও দিব্য অন্তর্দৃষ্টির বিশেষ অভিজ্ঞতা। এই ধারণাগুলোর মধ্যকার ফারাক আমাদের সামনে একটা মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে। জ্ঞান কি কেবল এমন কিছু, যা বাক্য, যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে অন্যের কাছে বয়ে নেওয়া যায়? নাকি জ্ঞানের এমন বাতেনি দিকও রয়েছে, যা মানুষের অভিজ্ঞতা ও উন্মোচনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়? এই কাজটাই করেছিলেন বাঙ্গালার বিভিন্ন ধারার তরিকার বুজুর্গগণ।

বাঙ্গালার ইতিহাসে শায়খ জালালউদ্দিন তাবরিজির নাম অত্যন্ত উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন বাগদাদের প্রখ্যাত সুফি শায়খ শিহাবুদ্দিন সুহরাওয়ার্দির সরাসরি শিষ্য। তাঁর হাত ধরেই বাঙ্গালায় সুহরাওয়ার্দি সিলসিলার স্থায়ী ও শক্ত ভিত রচিত হয়। পরবর্তী সুফি জীবনীগ্রন্থ যেমন সিয়ার আল-আরিফিন-এ তাঁর তাবরিজ, বাগদাদ এবং দিল্লি হয়ে বাঙ্গালায় আসার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। এই উৎসের কালগত দূরত্ব এবং হাগিওগ্রাফিক বয়ানের প্রকৃতি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তবুও এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে জালালউদ্দিন তাবরিজি লখনৌতি ও পান্ডুয়ার জনপদে এক নতুন ভূগোলের জন্ম দিয়েছিলেন।

গৌড়ে অবস্থিত আয়েনায়ে হিন্দ আখি সিরাজের দরগাহ। ছবি: দ্যা ইসলামিক হেরিটেজ
গৌড়ে অবস্থিত আয়েনায়ে হিন্দ আখি সিরাজের দরগাহ। ছবি: দ্যা ইসলামিক হেরিটেজ

পান্ডুয়ায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সুহরাওয়ার্দি খানকাহ এবং তার সঙ্গে একটি বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণের পরিসর বা ‘লাঙ্গার’। তাঁর এই খানকাহ সাধকদের জন্য ছিল ইবাদতখানা, আবার গরিব, দুঃখী, নিরন্ন ও পথচারীদের জন্য হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শ্রেণি, বর্ণ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই মানুষ সেখানে মুক্তি ও শান্ত্বনা খুঁজতে আসত। পরবর্তী সময়ে তিনি পাণ্ডুয়া থেকে দেওতালা অঞ্চলে (যা পরবর্তী সময়ে ‘তাব্রিজাবাদ’ নামে পরিচিত হয়) চলে যান। সেখানে তাঁর সাধনা ও আত্মমগ্নতার জন্য আজও চিল্লাখানা এবং তাকিয়ার ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায়। জালালউদ্দিন তাবরিজির সুহরাওয়ার্দি ধারার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে চিশতি সিলসিলার সাধকেরাও এই জনপদে যুক্ত হন। বিশেষ করে, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রিয় শিষ্য শায়খ আখি সিরাজ-আল-দিন উসমান বাঙ্গালার মাটিতে চিশতি আধ্যাত্মিকতার শেকড় আরও দৃঢ় করেন। দিল্লির পাঠচক্র শেষে তাঁকে ‘আইনা-ই-হিন্দুস্তান’ (হিন্দুস্থানের আয়না) উপাধিতে ভূষিত করে বাঙ্গালার দিকে পাঠানো হয়েছিল। তাঁরা কেবল খানকাহের নির্জন কোণে বসে থাকেননি, বরং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে বাঙ্গালার সমাজজীবনে রুহানিয়াতের স্থায়ী আবহ তৈরি করেছিলেন।

স্থানীয় দর্শন, যোগসাধনা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সাক্ষাৎ

এইখানে একটা বিষয় সংশোধন করা প্রয়োজন। এই লিখা পড়ে কেউ কেউ যদি ভাবতে শুরু করেন ত্রয়োদশ শতকের বাঙ্গালায় মুসলমানেরা এসে সবকিছু একদম নতুনভাবে শুরু করেছিলেন এবং এই জনপদ তখন একদম শূণ্যে ভাসছিল— এমন কথা ভাবা একদমই ভুল হবে। আমার লিখার একটা বড় অনুমাণ ও বর্গ হলো সংলাপ ও আদান-প্রদানের সক্রিয় পরিসর। এই জনপদে ইসলামের যে ভাবগত বিকাশ ও বিচ্ছুরণ তা এইখানে হাজির থাকা জ্ঞানগত ও ভাবগত ঐশ্বর্যে তৌহিদি হাকিকত ও মুহাম্মদী নূরের সক্রিয় ও সজীব সংলাপের মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয়েছে।

এই জনপদে বহু আগে থেকেই সংস্কৃত শাস্ত্রচর্চা ছিল। পাল যুগের ছিল বৌদ্ধ বিহার। এইখানে বিকাশ ঘটেছে ন্যায়দর্শন, তন্ত্রবিদ্যা এবং নাথযোগীদের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ধারা।

এই জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ‘অমৃতকুণ্ড’ গ্রন্থটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। যোগসাধনাসংক্রান্ত এই সংস্কৃত গ্রন্থটির আরবি অনুবাদ (হওজ আল-হায়াত) এবং পরবর্তী ফারসি রূপান্তর (বহর আল-হায়াত) ভারতীয় যোগজ্ঞান এবং ইসলামের রুহানি জগতের মধ্যকার ঐতিহাসিক যোগাযোগের এক অনন্য সাক্ষ্য। প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ ও সুফি কাজী রুকনউদ্দিন সমরকন্দী কামরূপের ভোজর ব্রাহ্মণের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই গ্রন্থটির অনুবাদ সম্পন্ন করেছিলেন। তবে অমৃতকুণ্ড-এর মূল ভাষা, অনুবাদের নির্দিষ্ট সময় এবং পাঠের পারস্পরিক বিন্যাস নিয়ে গবেষণাগত নানা বিতর্ক রয়েছে। এই অনুবাদ ও আলাপচারিতা আমাদের এক বৃহত্তর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, ভারতীয় শরীরতত্ত্ব ও যোগসাধনার ধারণাগুলো কীভাবে ইসলামি ভাষা, পরিভাষা এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্যে পুনর্ব্যাখ্যাত হয়েছিল? এটি কেবল একটি সরল ‘সমন্বয়বাদী’ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

কারণ একটা ঐতিহ্য যখন অন্য কোনো ঐতিহ্যের কোনো অনুশীলন বা কৌশল গ্রহণ করে, তখন তা হুবহু বা অন্ধভাবে তুলে নেয় না। সেখানে নতুন ভাষা, নতুন সীমারেখা এবং নতুন অনুশীলনগত উদ্দেশ্যের ভেতর দিয়ে তার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পূর্ণ পুনর্নির্ধারিত হতে পারে। যেমন, যোগসাধনার কোনো শ্বাসনিয়ন্ত্রণ বা মনঃসংযোগের পদ্ধতি যখন সুফি অনুশীলনের অংশে পরিণত হয়, তখন তার উদ্দেশ্য ও অভিজ্ঞতাগত অর্থ বদলে যায়। এই ধরনের অনুসন্ধান ধারণা ও অনুশীলনের কার্যকর পুনর্বিন্যাসের এক সুগভীর ইতিহাস উন্মোচন করে।

এই বৌদ্ধিক ও ভাষিক আদান-প্রদানের পরিমণ্ডলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রারম্ভিক আধুনিক যুগে সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি— এই তিনটি প্রধান ভাষা পন্ডিতসুলভ শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের প্রধান মাধ্যম হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। কার্ল ডব্লিউ. আর্নস্ট (Carl W. Ernst)-এর মতো গবেষকদের বিশ্লেষণে যেমন দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মুঘল যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা ও আইন থেকে শুরু করে দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব ও সুফিবাদ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ভাষাগুলো সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়েছিল। সংস্কৃত যেমন বৈদিক ও উপনিষদীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করত, আরবি তেমনি ইসলামি শরিয়ত ও কোরআন-হাদিসের ভাষ্য হিসাবে একটা সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বজায় রেখেছিল। অন্যদিকে, ফারসি ভাষা প্রশাসন, ইতিহাস এবং বিভিন্ন দর্শনের সংযোগ সেতু হয়ে উঠেছিল।

মুহম্মদ গাওসের বই জাওয়াহির-আল খামসা
মুহম্মদ গাওসের বই জাওয়াহির-আল খামসা

ঠিক এই ঐতিহাসিক গতিপথ ও ভাষার আদান-প্রদানের কাঠামোবদ্ধ রূপটি উন্মোচিত হয় প্রখ্যাত সুফি ও পণ্ডিত মুহাম্মদ ইবনে খাতিরুদ্দিন আল-গাউসের (মুহাম্মদ গাউস গোয়ালিয়রি) সাধনায়। কাজী রুকনউদ্দিন সমরকন্দীর সূচনা করা সেই অনুবাদ-পরম্পরাকে ইবনে খাতিরুদ্দিন ষোড়শ শতাব্দীতে আরও সুসংহত করেন। তিনি কাজী রুকনউদ্দিনের তর্জমাকে কেন্দ্র করে কেবল বহর আল-হায়াত-ই রচনা করেননি; বরং তাঁর লিখা গ্রন্থ আল-জাওয়াহিরুল খামস-এর ভেতরেও এই আত্মীকরণকে এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে যান। তিনি এর ভিতরে ইবাদত, মুয়ামালাত, অজিফা এবং আত্মিক সাধনার পদ্ধতি ও প্রণালী সমূহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। ইবনে খাতিরুদ্দিন এমনভাবে শাস্ত্র এবং অন্তিক অনুশীলনের সমবায় তৈরি করে দিয়েছেন, যা পড়লে কোনোভাবে এই গ্রন্থে যোগ বা তন্ত্রের কিছু আছে বলে মনে হবে না। অর্থাৎ কাজী রুকনউদ্দিনের হাত ধরে অনুবাদ হিসাবে যে আদান-প্রদানের সূচনা লখনৌতিতে হয়েছিল, ইবনে খাতিরুদ্দিনের জাওয়াহিরুল খামস-এ এসে তা সুফি তরিকাগত অনুশীলন ও ইবাদত-মুয়ামালাতের অঙ্গাঙ্গি অংশে পরিণত হয়। লখনৌতি ও বাঙ্গালার পলিমাটিতে শুরু হওয়া সেই সাক্ষাতের এ এক সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ও দার্শনিক পরিণতি।

৫. উপসংহার: শাহি বাঙ্গালার বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার

ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতি কেবল বিজয়ীদের তরবারির জোরে বা কোনো সামরিক আধিপত্যের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিল না। নতুন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আলেম, ফকিহ, শিক্ষক, সুফি ও প্রজ্ঞাবান পণ্ডিতেরা সেখানে যে গভীর সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, খলজি ও বলবনি যুগের সেই প্রাথমিক ভিত্তিই পরবর্তীতে স্বাধীন শাহি বাঙ্গালার সার্বভৌম বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রধান শর্ত তৈরি করে দিয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুনিয়াবি শাসন ও এলাহি অনুশাসনের মধ্যে ইনসাফ তৈরি করা। লখনৌতিতে প্রথিত কাজী পরিবারগুলোর— বিশেষত পঞ্চদশ শতকের আলেম কাজী তাজউদ্দীন আল-নাহভী আল-লখনৌতবী থেকে শুরু করে তাঁর বংশধর শত্তারি ধারাভুক্ত পণ্ডিত ও সুফি শাহ মনঝন লখনৌতবীর দীর্ঘ বৃত্তান্ত দেখুন। সুফি— যিনি দুনিয়াবি কাম-ক্রোধ থেকে মুক্ত সে যখন কাজির আসনে বসেন, তখন দুনিয়াবি হুকুমাত এবং এলাহি হিকমাহ একই ছন্দে এসে মিলে যায়। কাজী পরিবারের সদস্যরা একদিকে কাজীর আসনে বসে আইন, বিচার, উত্তরাধিকার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা—অর্থাৎ দুনিয়াবি শাসন পরিচালনা করছিলেন, অন্যদিকে তাঁরাই আবার মাদরাসা ও খানকাহের আঙিনায় দাঁড়িয়ে তাজকিয়া, ইবাদত, জিকির ও ওহির অভ্যন্তরীণ জ্ঞান—অর্থাৎ এলাহি শাসন প্রচার ও চর্চা করছিলেন।

দুনিয়াবি ও এলাহি— এই দুই শাসনের সুষম ভারসাম্যের ওপর ভর করেই শাহি বাঙ্গালায় নতুন এক ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়নিশানের ভাবগত বিপ্লব ঘটেছিল। এই ইনসাফের ঝাণ্ডা ধরে হাটছিলো সুলতানি প্রশাসনিক কাঠামো, মাদরাসার পরিসর এবং সুফি দরবেশের খানকাহ। যার মধ্য দিয়ে এই বাঙ্গালা যেন দুনিয়ার ইতিহাসে খোদা ও মানুষের লীলার ক্ষেত্র।

ত্রয়োদশ শতকের পর লখনৌতির সঙ্গে পাণ্ডিত্য ও রুহানিয়াতের সম্পর্ক কীভাবে পরবর্তী যুগে উপস্থিত ছিল, তার সাক্ষ্য এই কাজী পরিবারগুলোর জীবনীতে মিললেও, একে সরাসরি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার প্রমাণ হিসাবে দেখা ঐতিহাসিক ভুল হবে। এর গুরুত্ব অন্যত্র। এর মাধ্যমে আমরা দেখি যে পরবর্তী শতকগুলোতেও লখনৌতি একটি স্মরণযোগ্য বৌদ্ধিক ও শিক্ষাগত পরিসর হিসাবে ব্যক্তির পাণ্ডিত্যপূর্ণ পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এমনকি নবদ্বীপের নব্য-ন্যায় ঐতিহ্য এবং ইসলামি মানতিকের মধ্যকার তুলনামূলক গবেষণার সম্ভাবনার মতো লখনৌতির ইতিহাসও আমাদের দেখায় যে, এখানে জ্ঞান ও সামাজিক জীবনের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক নির্মিত হচ্ছিল—যেখানে সালতানাত, মাদরাসা ও খানকাহ—এই তিনটি পরিসর পৃথক দ্বীপ ছিল না, বরং পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল।

প্রবন্ধের শুরুতে আমরা এথেন্সের সঙ্গে তুলনা করে একটা প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, ‘কোন জিনিস কোনো নগরকে ‘নগরে’ পরিণত করে?’ এরিস্টটলীয় ধারণায় নগর প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কেবল একটা পার্থিব বিন্যাস, নবুয়তি ঐতিহ্য দেখায় নগর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়ার বিপরীতে অতিপ্রাকৃতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হয়, সেইখানে থাকে মানুষের মহান হয়ে ওঠার বাসনা, তার বদলে মানুষের হতে হবে বিনয়ী ও তার নৈর্ব্যক্তিক চেতনার প্রতি আমানতদার। জগত ও মানুষ কেমন যেন একই চেতনারই দুই রূপ। সে জগতের দেহ দিয়েই নিজের দেহকে চেনে। ফলে তার আচরণ সর্বদা তার প্রতি বিনয়ী, অহংকারী নয়। বাঙ্গালা তাই স্রেফ ইটকাঠের দেওয়াল তুলে বানানো নগর বললে ভুল হবে, এটা একইসঙ্গে আরণ্যক ও নদীময়।

ফলে ওপরের এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর হয়তো আজও পুরাপুরি আমাদের হাতে নাই। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা ইতিহাসে তার গুরুত্বকে কখনোই খাটো করতে পারবে না। লখনৌতির আসল তাৎপর্য হলো এমন এক ঐতিহাসিক পরিসর নির্মাণে, যার মধ্য দিয়ে বাঙ্গালার পলিমাটি ও সমাজ ইসলামের বৃহত্তর ‘ইলম’ ও ‘হিকমাহ’র বিশ্বজাগতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে চিরকালের জন্য এক নতুন ও গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিল। দুনিয়াবি ইনসাফ ও এলাহি প্রজ্ঞার এই সম্বন্ধ অনুসন্ধান করাই শাহি বাঙ্গালার আসল বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার।


বরাত

১. আর্নস্ট, কার্ল ডব্লিউ. (Carl W. Ernst). Refractions of Islam in India: Situating Sufism and Yoga. নিউ দিল্লি ও লস অ্যাঞ্জেলেস: সেজ ও যোডা প্রেস, ২০১৬।

২. নায়ের, শঙ্কর (Sankar Nair). Translating Wisdom: Hindu-Muslim Intellectual Interactions in Early Modern South Asia. ওকল্যান্ড: ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ২০২০।

৩. আল-হাসানি, আবদুল হাই বিন ফখর উদ্দিন. নুযহাতুল খওয়াতির ওয়া বাহজাতুল মাসামিউ ওয়ান নাওয়াযির (الإعلام بمن في تاريخ الهند من الأعلام المسمى بـ (نزهة الخواطر وبهجة المسامع والنواظر)). ৮ খণ্ড. বৈরুত, লেবানন: দার ইবনে হাযম, ১ম সংস্করণ, ১৪২০ হি. / ১৯৯৯ খ্রি.।

৪. মিনহাজ-ই সিরাজ জুজজানি. তবাকাত-ই নাসিরি (طبقات ناصری). ত্রয়োদশ শতকের লখনৌতি ও বাংলার মুসলিম বিজয়ের প্রারম্ভিক ইতিহাস ও ঘটনাবলির অন্যতম প্রধান প্রাথমিক ঐতিহাসিক সূত্র।

৫. আল-গাউসি, মুহাম্মদ ইবনে খাতিরুদ্দিন আল-আত্তার. আল-জাওয়াহিরুল খামস (الجواهر الخمس: كتاب يبحث في أسرار العُبادة والطلاسم والأحوال والمقامَات ومعرفة الله تعالى). বৈরুত: দার আল-কুতুব আল-ইলমিয়াহ।

৬. করিম, আবদুল. সোশ্যাল হিস্ট্রি অব দ্য মুসলিমস ইন বেঙ্গল. চট্টগ্রাম: বাইতুশ শরাফ ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ১৯৮৫।

৭. শাহনাওয়াজ, এ কে এম (সম্পাদিত). ঐতিহাসিক আবদুল করিম: জীবন ও কর্ম. ঢাকা: ইতিহাস একাডেমি।

৮. মাসুমি, এম. সাগির হাসান. বেঙ্গলস কন্ট্রিবিউশন টু ইসলামিক লার্নিং-আই (Bengal’s Contribution To Islamic Learning-I)।

আরো দেখুন

ad585862-ce2d-4ff3-b4b9-047dfa5dad0d.png

অমৃতকুণ্ডের দুনিয়া সফর

ad585862-ce2d-4ff3-b4b9-047dfa5dad0d.png

বাহর-উল হায়াত: বাংলায় জন্ম নেয়া এক প্রাচীন পুস্তক

ad585862-ce2d-4ff3-b4b9-047dfa5dad0d.png

পটচিত্রে বাংলার চিরায়ত গল্পের বুনট

bottom of page