অমৃতকু ণ্ড: বাংলার যোগ, বাংলার তাসাউফ
অমৃতকুণ্ডের দুনিয়া সফর
লখনৌতিতে জন্ম নেয়া অমৃতকুণ্ডের অনুবাদ কেবল লখনৌতিতে সীমাবদ্ধ ছিলো না। ছড়িয়ে পড়েছিল হিন্দুস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে। আরবি সংস্করণ ইবনুল আরাবির নামে পরিচিতি অর্জন করার ঘটনা প্রমাণ করে বইটির প্রামাণ্য অবস্থান। এই প্রবন্ধে অমৃতকুণ্ডের সেই সফরকেই অঙ্কন করা হয়েছে।
লিখেছেন:
আসিফুল আবেদীন
প্রকাশিত:
২ নভেম্বর, ২০২৬

বাংলার যোগসাধনা কীভাবে ফারসি ও আরবি ভাষার মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করেছিল, তার অন্যতম সাক্ষ্য অমৃতকুণ্ড। যদিও গ্রন্থের মূল সংস্করণ আজও উদ্ধার করা যায়নি। তবে আরবি, ফারসি, তুর্কি ও উর্দু সংস্করণের পাণ্ডুলিপি বিদ্যমান। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায়, বঙ্গীয় যোগচর্চার কিছু ধারা মধ্যযুগ ও প্রাক্-আধুনিক যুগে মুসলিম পণ্ডিত, সুফি সাধক এবং পাঠকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল। এ দীর্ঘ যাত্রায় গ্রন্থটি হাউজ-আল হায়াত, মিরআত-আল-মাআনি এবং বাহরুল হায়াতের মতো বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। প্রতিটি ভাষান্তরে পরিবর্তন এসেছে বিষয়বস্তু ও ব্যাখ্যায়। ফলে সেই ইতিহাস একই সঙ্গে জ্ঞান, ভাষা ও তাসাউফের সফরের ইতিহাস।
অমৃতকুণ্ডের উৎপত্তি ও প্রাথমিক অনুবাদ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত আখ্যান অনুসারে, কামরূপের এক যোগী ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে লাখনৌতিতে আসেন। সেখানকার কাজী রুকনুদ্দিন সমরকন্দীর সঙ্গে আত্মার স্বরূপ নিয়ে আলোচনা হয়। পরে যোগীর কাছে প্রা প্ত একটি গ্রন্থ ফারসি ও আরবিতে অনুবাদ করা হয়। মূল গ্রন্থের ভাষা সংস্কৃত ছিল, নাকি হিন্দি বা অন্য কোনো ভারতীয় ভাষা; সেটি নিশ্চিত নয়। তা সত্ত্বেও এই আখ্যান বাংলার সঙ্গে ভারতীয় যোগসাধনার প্রাচীন ঐতিহ্য এবং মুসলিম বৌদ্ধিক জগতের সংযোগ অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজধানী লাখনৌতি ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন শাসকগোষ্ঠী ও পণ্ডিতসমাজের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। অমৃতকুণ্ডের অনুবাদ সেই যোগাযোগের তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। রিচার্ড ইটন বাংলায় ইসলামের বিস্তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্থানীয় সমাজ, ধর্ম ও মুসলিম সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। গ্রন্থটির আরবি সংস্করণ হাউজ-আল-হায়াত নামে পরিচিতি লাভ করে। অনুবাদটির তাৎপর্য কেবল যোগচর্চার বিবরণ আরবি ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং হাউজ-উল হায়াতের বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিলো ধারণাগত রূপান্তর। ভারতীয় যোগসাধনার কিছু ধারণাকে সুফি পরিভাষা, কোরআনিক উল্লেখ এবং ইসলামি দার্শনিক ভাষার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে পাঠকরা শ্বাসনিয়ন্ত্রণ, অন্তর্মুখী সাধনা ও ধ্যানের মতো অনুশীলনকে নিজেদের পরিচিত আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে পারতেন। কার্ল ডব্লিউ. আর্নস্ট এই প্রক্রিয়াকে যোগের ইসলামিকরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ভারতীয় যোগের কিছু ধারণা আরবি সংস্করণে নতুন পরিভাষা ও ব্যাখ্যা পেয়েছিল। কোথাও ভারতীয় ধর্মীয় নামের পরিবর্তে ইসলামি পরিচিতি এসেছে। কোথাও শ্বাস ও ধ্যানের অনুশীলনকে সুফি সাধনার সঙ্গে তুলনীয় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন সর্বত্র অভিন্ন ছিল না। বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে পাঠের পার্থক্য রয়েছে; সব সংস্করণে একই ব্যাখ্যাও ব্যবহৃত হয়নি। কোনো কোনো সংস্করণে হিন্দুস্তানি উৎসের চিহ্ন স্পষ্ট, কোনো কোনো সংস্করণে ইসলামি ভাষা ও দর্শনের উপস্থিতি বেশি।
আরবি পাণ্ডুলিপিতে গ্রন্থটির লেখক হিসেবে প্রখ্যাত সুফি দার্শনিক ইবনুল আরাবির নাম পাওয়া যায়। তবে, এই আরোপ সঠিক নয়। পাণ্ডুলিপির শিরোনাম ও প্রারম্ভিক অংশের অনুপস্থিতি, পাশাপ াশি বিভিন্ন সংস্করণের পাঠগত পার্থক্য, এমন ভুল পরিচয়ের পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। বাংলায় লেখা একটি যোগগ্রন্থ আরবি ভাষায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সেটিকে মুসলিম বিশ্বের বিশিষ্ট সুফির রচনা বলে ভ্রম হয়; এই ঘটনা গ্রন্থটির সাংস্কৃতিক অভিযোজনের গভীরতা তুলে ধরে।

অমৃতকুণ্ডের বিস্তারে চিশতি সুফি আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গোহির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যোগচর্চা সম্পর্কে তার জ্ঞান অনেকে আলোচনা করেছেন। শিষ্যদের কাছে তিনি হাউজ-উল হায়াত পড়াতেন। বোঝা যায়, ভারতীয় যোগের সঙ্গে সুফি সাধনার সংযোগ শিক্ষাদান ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনেও প্রবেশ করেছিল। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেখ মুহাম্মদ গাউস গোয়ালিয়রির বাহর-উল হায়াত। ষোড়শ শতকে রচিত ফারসি গ্রন্থটিতে অমৃতকুণ্ডের উপাদানকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, গাউসের রচনা আগের পাঠের সরল অনুবাদ নয়; বরং সমসাময়িক যোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত রূপ। এতে হঠযোগের অনুশীলনকে সুফি সাধনার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যায়। এই সংস্করণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হলো এর সচিত্র পাণ্ডুলিপি। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০০ থেকে ১৬০৪ সালের মধ্যে এলাহাবাদে যোগের ওপর কয়েকটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যোগাসনের একুশটি চিত্র নিয়ে এই পাণ্ডুলিপি শুধু গ্রন্থটির সৌন্দর্য বাড়ায়নি; বরং যোগের অনুশীলনকে নথিবদ্ধ করারও গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করেছে। অর্থাৎ যোগ সম্পর্কে আগ্রহ কেবল সুফি খানকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মোগল দরবারে জ্ঞান, চিত্রকলা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যও এর বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল।

মোগল শাসক জাহাঙ্গীরের আমলে বাহর-উল হায়াত চিত্রশিল্পের রূপ লাভ করেবাংলার ইতিহাসে ফারসি ভাষার গুরুত্ব অগ্রগণ্য। ফারসি এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন প্রশাসন, সাহিত্য, ইতিহাসচর্চা ও উচ্চতর বৌদ্ধিক বিনিময়ের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো। ফলে ফারসি ভাষায় রচিত বাহর-উল হায়াত যোগের ধারণাকে এমন পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিল, যাদের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের যোগাযোগ ছিল।
অমৃতকুণ্ড–এর অনুবাদ-পরম্পরা ফারসি ও আরবিতে থেমে থাকেনি। এর আরবি ও ফারসি সংস্করণের বিভিন্ন রূপ তুর্কি ও উর্দু ভাষায়ও ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দুস্তানি যোগের ধারণা আনাতোলিয়ার সুফি পরিমণ্ডলে পৌছানোর সাক্ষ্য বহন করে তুর্কি পাণ্ডুলিপি। বিভিন্ন সংগ্রহে হাউজ-উল হায়াত ও এর তুর্কি অনুবাদের একাধিক পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া গেছে। আরবি সংস্করণের বহু পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব গ্রন্থটির পাঠকপ্রিয়তার প্রমাণ। ইয়েমেনসহ আরব অঞ্চলের সংগ্রহেও এর বিভিন্ন সংস্করণের উপস্থিতি ব্যাপারে জানা যায়। ইউরোপের গ্রন্থাগারগুলোয় সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে, এই জ্ঞানভাণ্ডার পরবর্তী সময়ে সংগ্রাহক, গবেষক ও প্রাচ্যবিদদের মনোযোগও আকর্ষণ করেছিল। ফারসি বাহর-উল হায়াত পরবর্তী সময়ে উর্দুতেও অনূদিত হয়। এর মধ্য দিয়ে যোগের ধারণা উপমহাদেশের একাধিক ভাষিক পরিসরে প্রবেশ করে। অর্থাৎ, গ্রন্থটির জীবন কেবল মধ্যযুগীয় আরবি-ফারসি পাণ্ডুলিপির জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তী শতকেও ভাষা ও পাঠকসমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি নতুন ভাষান্তর গ্রন্থটিকে নতুন পাঠক দিয়েছে, আবার উপস্থাপনেও পরিবর্তন এনেছে। এই ধারাবাহিক পুনর্লিখন ও পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই অমৃতকুণ্ডের জ্ঞান বিভিন্ন অঞ্চল ও ভাষার বৌদ্ধিক জগতে প্রবেশ করেছে।

অমৃতকুণ্ড, হাউজ-উল হায়াত ও বাহরুল হায়াতেরর ইতিহাস এভাবে ব্যাপক ও বিস্তৃত। এর বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন অনুবাদক, সুফি সাধক, পাণ্ডুলিপি-নকলকারী, দরবারি পৃষ্ঠপোষক ও পাঠকের মধ্য দিয়ে। আরবি ভাষা গ্রন্থটিকে ইসলামি দর্শন ও সুফি পরিভাষার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে; ফারসি ভাষা বাংলা ও এশিয়ার সাহিত্যিক পরিসরের মধ্যে চলাচল সহজ করেছে; তুর্কি ও উর্দু অনুবাদ নতুন পাঠকসমাজে উপস্থিতি বিস্তৃত করেছে। মোগল দরবারের সচিত্র পাণ্ডুলিপি এই জ্ঞানকে দৃশ্যশিল্পের অংশ করে তুলেছে। বাংলায় জন্ম নেয়া একটি গ্রন্থ যেভাবে বৈশ্বিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠলো; তা গাঙ্গেয় সভ্যতার গৌরবময় স্বাক্ষর।



