অমৃতকুণ্ড: বাংলার যোগ, বাংলার তাসাউফ
বাহর-উল হায়াত: বাংলায় জন্ম নেয়া এক প্রাচীন পুস্তক
ত্রয়োদশ শতকের অমৃতকুণ্ড তথা বাহর-উল হায়াত বাংলার ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। প্রাচীন যোগসাধনার গ্রন্থ অমৃতকুণ্ড ফারসি ও আরবি ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইস্তাম্বুল পর্যন্ত। এই লেখা অনুসন্ধান করেছে অমৃতকুণ্ডের বিষয় ও সমকালীন বাংলার প্রেক্ষাপটকে। চর্যাপদের সহজিয়া বৌদ্ধ সাধনা, নাথযোগের দেহতত্ত্ব এবং অমৃতকুণ্ডে বর্ণিত যোগচর্চার মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগের সূত্র ধরে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে কায়া-সাধনা বাংলার বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। উন্মোচিত হয়েছে বাংলার বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের পারস্পরিক আদান-প্রদানের গল্প।
লিখেছেন:
আহমেদ দীন রুমি
প্রকাশিত:
২ নভেম্বর, ২০২৬

সপ্তদশ শতকের ফারসি পাণ্ডুলিপিতে অঙ্কিত যোগাসন (বীরাসন) ছবি: চেষ্টার বেটি লাইব্রেরি
ভোজর ব্রাহ্মণ যেদিন লখনৌতিতে পৌঁছলেন, সেদিন জুমা বার। তিনি এসেছেন কামরূপ থেকে। কামরূপ যোগের দেশ, আর সেখানকার যোগী মাত্রই জানেন তার সাধনার কথা। সেখান থেকে লাখনৌতির দূরত্ব কম না। কিন্তু যোগী মনের খচখচানি নিরসন তার চেয়ে জরুরি। ফলে যতটা দ্বিধাহীন হয়ে লাখনৌতির পথে পা দিয়েছেন, অতটা দ্বিধাহীনতা নিয়েই ঢুকে পড়লেন মসজিদে। খুঁজলেন প্রধান আলেমকে; যিনি তার মনকে শান্ত করতে পারবেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে মুসল্লরিা ইশারা দিলেন রুকনুদ্দিন সমরকন্দীর দিকে। রুকনুদ্দিন প্রধান বিচারপতি। লাখনৌতির বিচারপতি মানে তো আর যেন তেন কথা নয়। বলতে গেলে শাসক আলি মর্দান খলজির সমান্তরাল ক্ষমতা। অবশ্য চেহরা দেখে বোঝার জো নেই। খুব সাদাসিধে স্বভাবের শান্ত সৌম্যপুরুষ। তিনি সহাস্যে আমন্ত্রণ জানালেন যোগীকে। যোগী এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন- আপনারা কার ইবাদত করেন?
উত্তর দেয়া হলো, অদৃশ্যের অধিপতি মহিমান্বিত আল্লাহর।
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের নেতা কে?
জবাব এলো, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (সা.)।
ফের জিজ্ঞাসা করলেন, আত্মা সম্পর্কে তিনি কী জানিয়েছেন?
উত্তর পেলেন, এটি প্রতিপালকের আদেশ।
জবাব শুনে ভোজর ব্রাহ্মণ উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলেন। বললেন, আপনার কথা যথাযথ। ঠিক এটা ই আমরা পেয়েছি পূর্ববর্তী কিতাবে। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হলেন। সেই জ্ঞানচর্চা এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল যে, ওলামায়ে কেরাম তাকে ফতোয়া দেয়ার অনুমতি পর্যন্ত দিলেন। উপহার হিসেবে তিনি নিজে কাজীকে দিলেন ‘অমৃতকুণ্ড’ নামে গ্রন্থ। কাজী গ্রন্থটি পড়ে রীতিমতো বিস্মিত। এতটা গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন, যেন যোগীর স্তরে পৌঁছে গেছেন। সেই মুগ্ধতা ও মনোনিবেশ পরিণতি পায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে। হিন্দুস্তানের ভাষা থেকে গ্রন্থটি ফারসি এবং আরবিতে অনুবাদ করলেন কাজী।

বাহর-উল হায়াতের জন্মকথা খুঁজতে গেলে বারবার এই আখ্যানই সামনে আসে। বইটি ফারসি। আরবিতে অনূদিত হয়েছে হাউজ-উল হায়াত নামে। ক্রমে অনুবাদ সমগ্র হিন্দুস্তানে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ষোড়শ শতকে এটাকে পরিবর্ধন করেন উত্তর ভারতের সুফি মুহম্মদ গাউস। ততোদিনে হিন্দুস্তান ছাপিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং আনাতোলিয়ার সুফি মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়ে উঠেছে বইটি। বর্তমানেও বেশ কিছু আরবি ও ফারসি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের লাইব্রেরিতে। মুসলিম বিশ্বে কোনো ভারতীয় যোগগ্রন্থ এতটা প্রভাব ফেলেছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
বাংলার সঙ্গে বাহর-উল হায়াতের সম্পর্কের বিষয়ে কিছু ঐতিহাসিক নোকতা হাজির করা যায়। বর্ণনায় যোগীর নাম ভোজর ব্রাহ্মণ। তিনি এসেছেন কামরূপ থেকে। ত্রয ়োদশ শতকের কামরূপ ছিল বজ্রযান, সহজযান ও তন্ত্রযান বৌদ্ধ ধারার অন্যতম কেন্দ্র। বাংলা থেকে কামরূপ, নেপাল ও তিব্বতে এই ধারার বিস্তার। নেপাল ও তিব্বত এখনো গুহ্যসাধকদের শিক্ষা ও প্রেরণার কেন্দ্র। তাই আরবি-ফারসির ‘ভোজর ব্রাহ্মণ’ দিয়ে সম্ভবত ‘বজ্রব্রহ্ম’ নামের কোনো ব্যক্তি, কিংবা বজ্রযান ধারার কোনো অনুসারীকেই বোঝানো হয়েছে। পরবর্তী আরবি অনুবাদে যোগীর নাম পাওয়া যায় ‘অম্বুয়ানাথ’; এদিক থেকে নাথ বিশ্বাসের সঙ্গেও তাকে যুক্ত করা যায়। বজ্রযান বৌদ্ধমত কিংবা নাথ বিশ্বাস; উভয়ের সঙ্গে কায়া-সাধনার সংযোগ স্পষ্ট।

কামরূপের সেই যোগী ছিলেন কায়াসাধক, আর বিষয়বস্তু বিচারে অমৃতকুণ্ডও কায়া-সাধনারই প্রাচীন নিদর্শন। কায়া-সাধনা বাংলার বৌদ্ধ, জৈন, ব্রাহ্মণ্য ও মুসলিম, সব ধারাকেই প্রভাবিত করেছে। নাথ ধারা নিজে কায়া-সাধনায় প্রভাবিত। মীননাথ ও গোরক্ষনাথের নামের সঙ্গে জড়ানো এই ধারার ঐতিহ্য বাংলা ও তার আশপাশে বহুদূর ছড়িয়ে ছিল। এদিকে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ সহজিয়া বৌদ্ধ মতের অনুসারী। বিস্ময়কর নয় যে, এর মুখ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে কায়া-সাধনা। এই সূত্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যেও ছড়িয়ে আছে। মধ্যযুগে সৈয়দ সুলতানের জ্ঞানপ্রদীপ, আলী রজার জ্ঞানসাগর এবং যোগ-কলন্দরের মতো পুঁথিতে সুফি ভাবনার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে নাথ-যোগের পরিভাষা। বাউলদের দেহতত্ত্বেও একই উত্তরাধিকারের ছাপ স্পষ্ট। এভাবে চর্যাপদ, অমৃতকুণ্ড ও বাহর-উল হায়াত শুধু কাছাকাছি সময়ের নয়, কাছাকাছি চর্চা-পদ্ধতিরও প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলার পরবর্তী বিশ্বাসের স্রোত এদের ঐতিহাসিকতাকে যেন যুক্ত করে দেয় অজ্ঞাত বন্ধনীতে। ঠিক এ কারণেই অমৃতকুণ্ডের প্রকৃত ভাষা পালি, সান্ধ্য ও কাছাকাছি কোনো ভাষা হওয়া অমূলক নয়।

অনুবাদক কাজী রুকনুদ্দীন মুহাম্মদ সমরকন্দী সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। বর্ণনায় বোঝা যায়, তিনি ছিলেন হানাফি ফকিহ, সুফি এবং কালামশাস্ত্রে পারদর্শী। ভিন্ন ধর্মের গ্রন্থ পড়তে, ভাষা শিখতে ও চর্চা করতে তার মধ্যে দ্বিধা ছিলো না। কেউ কেউ তাকে সমরকন্দের কাজী রুকনুদ্দীন আবু হামিদ মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-আমীদী হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই দাবি অমূলক না। তিনি প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ ও সুফি ছিলেন। ছিলেন একজন সুপরিচিত ধর্মতাত্ত্বিক। তার রচিত বইয়ের মধ্যে ছিলো কিতাবুল ইরশাদ। তিনি বুখারায় ৯ই জমাদিউস সানি, ৬১৫ হিজরি অর্থাৎ ১২১৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। যেহেতু সুলতান আলী মর্দান খলজি ১২১০ থেকে ১২১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত লাখনৌতি শাসন করেছেন; ফলে ধরে নেয়া যায় এই সময়ে তিনি বাংলায় উপস্থিত ছিলেন। সম্ভবত পরবর্তীতে জন্মভূমিতে ফিরে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
হিন্দুস্তানি ভাষায় লেখা পুস্তকটি বর্তমানে নেই। হিন্দুস্তানি বলতে সম্ভবত পালি, সান্ধ্য বা সংস্কৃত। ফারসি ও আরবি ভাষায় বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বইটি ১০টি অধ্যায়ে বিভক্ত। শেষভাগে হৃদপিণ্ডের গঠন সংক্রান্ত একটি আলোচনা বাড়তি হিসেবে যুক্ত। শুরুতে রয়েছে সুফি ধাঁচের কিছু রূপক। প্রথম অধ্যায়ে ঠাঁই পেয়েছে মানুষের স্বরূপ। মানবদেহকে ক্ষুদ্রব্রহ্মাণ্ড তথা আলমে সগির হিসেবে এবং মহাবিশ্বকে আলমে কবির হিসেবে চিত্রিত করেছেন লেখক। নাকের ডান ছিদ্র হলো সূর্য ও বাম ছিদ্র হল চন্দ্র। ইন্দ্রিয় হলো নক্ষত্রমণ্ডলী, মাথা আকাশ, কঙ্কাল পর্বতমালা, রক্তনালী নদ-নদী এবং আনন্দ-বেদনা ঋতু। এ অধ্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের ভারসম্য নিয়ে রয়েছে কিছু যোগচর্চার উল্লেখ।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় শ্বাসবায়ুর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া। এক্ষেত্রে পাঁচ প্রকারের শ্বাস বায়ু ও তাদের প্রকৃতি নিয়ে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে সন্তান উৎপাদনের লিঙ্গ নির্ধারণ (সূর্যশ্বাসে পুত্র, চন্দ্রশ্বাসে কন্যা), হজমপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর পদ্ধতি এবং লালা ও কানের চিকিৎসাগত ব্যবহারের বিবরণ। তৃতীয় অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় হৃদয়ের রহস্য ও স্বরূপ। এখানে হৃদপিণ্ডকে মহাবিশ্বের রাশিচক্রের বারোটি চিহ্নের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। হৃদয়ের ডান দিককে পুণ্যের ও বাম দিককে শয়তানের প্ররোচনার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্জন স্থানে বসে আত্মপর্যালোচনার মধ্য দিয়ে হৃদয়ের গতি পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে বলা হয়েছে। লেখকের দাবি অনুসারে, পাশবিক প্রবৃত্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে দমন করাই পরম আনন্দের চাবিকাঠি।

চতুর্থ অধ্যায়ে ঠাঁই পেয়েছে শারীরিক আসন ও ব্যায়াম। গ্রন্থে মোট ৮৪টি যোগাসনের উল্লেখ আছে। সেগুলোর মধ্যে পাঁচটি প্রধান আসনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া। পদ্মাসনের ভঙ্গিতে পা ভাঁজ করে মেরুদণ্ড সোজা রেখে নাভির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এবং মনে মনে ইসমে আজম জপ করা। কুক্কুটাসন সদৃশ দুই ঊরুর ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মাটিতে ভর দিয়ে সম্পূর্ণ দেহ বাতাসে ঝুলিয়ে রাখা। গর্ভাসন সদৃশ হাত ঊরুর মধ্য দিয়ে বের করে কাঁধ বা ঘাড় জড়িয়ে ধরে থাকা। ময়ূরাসন সদৃশ মাটিতে হাতের তালুর ওপর সম্পূর্ণ শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রতিটি আসনের পৃথক পৃথক উপকারের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে আত্মিক বায়ু ও প্রাণতত্ত্ব প্রসঙ্গ। নাভিকে কেন্দ্র করে যে প্রাণশক্তি থাকে, তার বিবরণ এখানে উঠে এসেছে। পুস্তক অনুসারে, মানুষ শ্বাস নেয়ার চেয়ে প্রশ্বাসে বেশি শক্তি ক্ষয় করে। গভীর প্রাণায়ামের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে উল্টে দিয়ে দীর্ঘায়ু ও অমরত্ব অর্জন সম্ভব।
বাহর-উল হায়াতের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ব্রহ্মচর্য। লেখকের দাবি অনুসারে, ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যৌনমিলন অনুমোদিত হলেও এর পরে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য পূর্ণ ব্রহ্মচর্য অপরিহার্য। অতিরিক্ত কামলিপ্সা ও বীর্যক্ষয়কে মৃত্যুর সমতুল্য। ভ্রমণের মাধ্যমে, উপবাস করে এবং যোগপদ্ধতিতে প্রাণরসকে মস্তিষ্কে টেনে তোলার সাধনা করার নির্দেশ দিয়েছেন লেখক। সপ্তম অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে চক্র ও মন্ত্র নিয়ে। মনের সংকল্প ও কল্পনাশক্তির গভীরতা দিয়ে জগতের বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব। দেহের বিভিন্ন চক্রে ৭টি গ্রহের প্রতীকী শব্দ ও জ্যামিতিক নকশার ধ্যান করতে বলা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, উপযুক্ত সাধনার মাধ্যমে রূপ পরিবর্তন সম্ভব। অষ্টম অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় মৃত্যুর পূর্বাভাস ও প্রতিকার। মৃত্যুর লক্ষণ আগে থেকে বোঝার প্রক্রিয়া। পুস্তকের দাবি, সকালে সূর্য ওঠার সময় নিজের ছায়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আকাশের দিকে তাকালে একটি শ্বেত প্রতিবিম্ব দেখা যায়। সেই ছায়ার মাথা না থাকলে আয়ু মাত্র তিন দিন, কান না থাকলে পনেরো দিন এবং ঘাড় না থাকলে সাত দিন অবশিষ্ট থাকে। বিশেষ শ্বাসচর্চা ও সাধনার মাধ্যমে এসব প্রভাব রুখে দেওয়ার উপায় এতে উল্লেখ আছে।
পুস্তকের নবম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তি ও যোগিনী-সাধনা নিয়ে। মহাবিশ্ব এবং মানবদেহে সাতজন নারী আধ্যাত্মিক শাসক বা যোগিনীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। সাদা চন্দন কাঠের পাটাতনে নির্দিষ্ট ছক এঁকে এবং গন্ধদ্রব্য জ্বালিয়ে সাধনা করার পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ পুস্তকে এতে রয়েছে। দশম অধ্যায় হলো সাধনার সমাপ্তি ও আত্মোপলব্ধির ওপর। লেখকের মতে, মানুষ হলো একটি উল্টানো বৃক্ষ, যার শিকড় আকাশে এবং শাখা-প্রশাখা পার্থিব জগতে। বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ ও আসক্তি থেকে মনকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে অন্তর্মুখী করার মাধ্যমে পরম সত্য উপলব্ধি হয়। এভাবেই সাধক তার আত্মস্বরূপ চিনে ফেলে এবং উপলব্ধি করে যে সে এক পরম একেরই অংশ। অর্থাৎ এক এবং এক মিলে একই হয়।
অধ্যায়গুলোর শেষে একটি অতিরিক্ত পরিচ্ছেদ যুক্ত রয়েছে, যেখানে মানুষের হৃদপিণ্ডের গঠন, এর রূপ, রক্ত চলাচলের প্রকোষ্ঠ এবং শিরা-উপশিরার সাথে যকৃতের সম্পর্কের মধ্যযুগীয় শারীরস্থানিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এভাবে বাহর-উল হায়াত পরিণত হয়েছে ত্রয়োদশ শতাব্দীর অন্যতম বিরল গ্রন্থ, যেখানে হিন্দুস্তানের নাথ যোগসাধনা, তন্ত্র ও প্রাণায়ামের সাথে সুফি দর্শনের মেলবন্ধন ঘটেছে।
বাহর-উল হায়াতের সবচেয়ে কৌতূহলজনক দিক হলো, এটা শুধু শব্দে শব্দে অনুবাদ নয়। ফারসি-আরবি রূপে যোগের ধারণাগুলো সুফি ও ইসলামি ভাষায় সাজানো। শুরুর আখ্যানেই তার ইঙ্গিত আছে; যোগী প্রশ্ন করেন আত্মা নিয়ে, উত্তর আসে কুরআনের ভাষায়। গবেষকেরা একে বলেন যোগের ইসলামীকরণ। অর্থাৎ ভিন্ন ঐতিহ্যের জ্ঞানকে নিজের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে জায়গা করে দেয়া। প্রশ্ন হলো, এই রূপান্তর কতটা অনুবাদ আর কতটা নতুন সৃষ্টি। সুফিদের ভেতরে এ নিয়ে মতভেদ ছিল, কারণ কেউ কেউ এসব অনুশীলনকে সন্দেহ করতেন, আবার কেউ এর মধ্যে নিজেদের জিকির, মুরাকাবা ও শ্বাসনিয়ন্ত্রণের চর্চার মিল খুঁজে পেতেন। এই মিলের কারণেই গ্রন্থটি এত দীর্ঘ সময় ধরে সুফি মহলে টিকে থাকতে পেরেছে। বাংলার নিজস্ব স্বরের মধ্য দিয়ে অনেক সুফিই এভাবে ইসলামের চেতনাকে হাজির করেছেন। ইসলামের এই স্বদেশীকরণ করার সফলতাই সম্ভবত এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্ময়কর উত্থানের পেছনে এটাও একটা কারণ।
অমৃতকুণ্ডে তথা বাহর-উল হায়াতের মতো সংলাপের আরও কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সংস্কৃত গ্রন্থ শেক শুভোদয়াতে। সেখানে সুফি সাধক শেখ জালালউদ্দীন তাবরিজির সঙ্গে স্থানীয় সাধুদের আলাপ-বিতর্ক আছে। সেই সময়ের সাধুরা এই শায়খের দ্বারা প্রভাবিত হন। গ্রন্থটি সাধারণত লক্ষ্মণসেনের দরবারের সঙ্গে যুক্ত বলে ধরা হয়। অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকের বাংলায় যোগী ও সুফির সংলাপ শুধু একটি গ্রন্থের কাহিনি ছিল না; ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ধর্মের রচনায় মিশে আছে তার ছাপ।
বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্থানের শুরু বখতিয়ার খলজির মধ্য দিয়ে। তার এক দশকের মধ্যে লাখনৌতিতে বাহর-উল হায়াতের হদিস পাওয়া বেশ চমকপ্রদ। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ব াংলার প্রথম দিককার মুসলমানদের সম্পর্কের একটা দিক উন্মোচিত হয়। স্পষ্ট হয় জ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা ও উদারতার ব্যাপারে তাদের আগ্রহও। বাহর-উল হায়াতের ভাষা ফারসি, বিষয়বস্তুতে প্রাচীন বাংলার প্রভাব এবং বিশ্বাসে ইসলামের কর্তৃত্ব; এভাবে মধ্যযুগের বাংলা ছিলো বহু স্রোতের সজীব মোহনা, যেখানে বৌদ্ধ, নাথ, ব্রাহ্মণ্য ও সুফি ধারা পরস্পরকে বুঝার চেষ্টা করেছে। এই বহুত্বই বাংলার সংস্কৃতিতে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলছে পরবর্তী প্রায় হাজার বছর ধরে।



