top of page

অমৃতকুণ্ড: বাংলার যোগ, বাংলার তাসাউফ

সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়া প্রসঙ্গে হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কি’র যিয়াউল কুলুব

সুফিবাদ ও যোগদর্শনের সম্পর্ককে কি কেবল ঐতিহ্যে ধারণা ও অনুশীলনের স্থানান্তর হিসেবে দেখা যায়? এই প্রশ্নের জবাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর সুফি হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কির হাজির করেন নয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক জগৎ। তার লেখা যিয়াউল কুলুব গ্রন্থটিতে যোগদর্শনের শারীরিক ভঙ্গি, শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও ধ্যানপদ্ধতি নতুন অর্থ পেয়েছে সুফি পরিসরে। কিন্তু এই আত্মীকরণের উদ্দেশ্য কী ছিল? গবেষক ও লেখক মেহেদী হাসান এই প্রবন্ধে যিয়াউল কুলুব পাঠের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধান করেছেন সুফি ও যোগদর্শনের ঐতিহাসিক বোঝাপড়া, অনুশীলনের পারস্পরিক বিন্যাস এবং আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের অন্তর্নিহিত রাজনীতি।

লিখেছেন:

মেহেদী হাসান

প্রকাশিত:

২ নভেম্বর, ২০২৬

মেহেদী হাসান
​

সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়া নিয়ে এই আলাপে আমরা ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি সুফি প্র্যাকটিস ম্যানুয়াল বা ওজিফা-কেন্দ্রিক কিছু পর্যবেক্ষণ হাজির করব। যিয়াউল কুলুব বা হৃদয়ের আলো নামের এ ওজিফার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, এই আলোচনায় বাংলা শব্দ সুফিবাদকে তাসাওউফ বা তজকিয়াতুন নফসের সমার্থক হিসেবেই বুঝব। এটির লেখক হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কি (১৮১৭–১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ)। সমকালীন গবেষকেরা এ বইয়ের ডিসকোর্সকে অভিহিত করেছেন ভক্তিমূলক ধ্যান ও কল্পনানির্ভর শারীরবিদ্যার এক কৌতূহলোদ্দীপক মিশ্রণ হিসেবে। এই মন্তব্য বিবেচনায়, সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়া নিয়ে আলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো যিয়াউল কুলুব।

ছবি: যিয়াউল কুলুব বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: যিয়াউল কুলুব বইয়ের প্রচ্ছদ

সাম্প্রতিককালের একাডেমিতে সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিসরে উল্লিখিত বোঝাপড়ার আলাপ-কেন্দ্রিক কার্ল ডব্লিউ. আর্নস্ট থেকে স্কট এ. কুগল এবং আর্থার এফ. বুহলার পর্যন্ত পদ্ধতিগতভাবে-কঠোর এবং তাত্ত্বিকভাবে-জ্ঞাত একটি ধারা গড়ে উঠেছে। এই ধারার সঙ্গে সংলাপ বজায় রেখেই আমরা একটি ভিন্ন বিশ্লেষণী কাঠামোতে যিয়াউল কুলুবে উল্লিখিত সুলতানুল আযকার শোগুল এবং সুলতানুল আযকার যিকর নিয়ে কিছু কথা হাজির করব। সাম্প্রতিককালের আরেকটি গবেষণায়, এই দুটি বিষয়কেই চিশতিয়া সাবিরিয়া তরিকার এ সাধকের যোগদর্শনের পরিভাষা ও অনুশীলনকে তজকিয়াতুন নফসের উপযোগী করে গ্রহণ ও পুনর্বিন্যাস করার অন্যতম ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখানে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তিনি কেন এবং কীভাবে যোগদর্শনের পরিভাষা ও অনুশীলনকে তজকিয়াতুন নফসের উপযোগী করে গ্রহণ ও পুনর্বিন্যাস করেছিলেন? এবং কী পরিস্থিতি বা অবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি এই অনুশীলনকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন? মোদ্দা কথায় অর্থাৎ, এর পেছনে হাজি ইমদাদুল্লাহর উদ্দেশ্য কী ছিল

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হাজি ইমদাদুল্লাহর উদ্দেশ্য

ইমদাদুল্লাহ ছিলেন একজন মুসলিম সাধক, আবার ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী আলেম। তাঁর জীবদ্দশায় একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা বিজয়ী শক্তি হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করছিল। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর ভূমিকাকে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যিনি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজের অসুস্থ দেহটিকে পরীক্ষা করছেন। একদিকে, তিনি কঠোরভাবে শরিয়তের বিধিবিধান পালনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন; অন্যদিকে, সেই দেহের ধমনিগুলো পরিষ্কার করা এবং হৃদযন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার জন্য ধ্যান ও গভীর রূপান্তরমূলকচর্চার পদ্ধতি হাজির করেছেন।

কিন্তু নিরঙ্কুশ অর্থে তিনি বলছেন, “শরিয়তের সীমার বিপরীত কাশফ ও মুকাশাফার কোনো মূল্য নেই। হারাম কাজ হতে দূরে থাকার এবং কবিরা গুনাহসমূহ হতে বেঁচে থাকার খুবই তাগিদ দিতে হবে। স্পষ্টভাবে বলে দিতে হবে, যিকর-শোগুল তুলনায় শরিয়তের হুকুম-আহকামের স্থান সবার আগে ও ঊর্ধ্বে।" (যিয়াউল কুলুব, বাংলা অনুবাদ মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী, পৃষ্ঠা : ২৫)

যিয়াউল কুলুবের বাংলা অনুবাদ, ছবি: বায়তুশ শরফ
যিয়াউল কুলুবের বাংলা অনুবাদ, ছবি: বায়তুশ শরফ

তাঁর মতে, সালিক বা সাধকের পক্ষে ততক্ষণ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব হবে না, যতক্ষণ না সে একজন বাতিনি রোগবিষয়ে সত্য ও সূক্ষ্মদর্শী চিকিৎসক কর্তৃক প্রদত্ত ওষুধপত্রাদি ব্যবহার করে ওইসব রোগের মূলোৎপাটন করে নিজের মধ্যে গুণাবলি সৃষ্টি করে। এই বাতিনি রোগগুলোর সঙ্গে আবার আমাদের শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন উদাসীনতা ও গাফিলতি খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে আমাদের শরীর ও মনকে শতভাগ সতর্কতা বা তকওয়ার আবহে সক্রিয় করে তুলতে হয়। এই অবস্থায় তথা হুজুরে দিল বা কলবে উপনীত হতে দরকার বিশেষ যিকর-শোগুল বা রূপান্তরমূলকচর্চা। এই অনুশীলনগুলোর জন্য আবার শরীর ও মনের বিশেষ প্রস্তুতি (তাহারাত) প্রয়োজন; পাশাপাশি প্রয়োজন নিরিবিলি ও নির্জন-বাস (খালওয়াত)। এই রূপান্তরমূলক চর্চাকে খুব সাধারণভাবে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়: তাওয়াজ্জুহ (মনোসংযোগ), যিকর ও মুরাকাবা (স্মরণ ও ধ্যান) এবং মুশাহাদা (প্রত্যক্ষ দর্শন)।

আবার, শরীর ও মনকে সক্রিয় করে রূপান্তরমূলকচর্চায় বিশেষ ধরনের শারীরিক ভঙ্গি ধারণ করা দরকার। এই প্রসঙ্গে নফি-ইসবাতের প্রথম পদ্ধতির শুরুতে হাজি ইমদাদুল্লাহ’য় আছে: “এরপর চারজানু বসবে। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল এবং এর পার্শ্ববর্তী আঙুলের সাহায্যে কাইমাস ধমনিকে চেপে ধরবে, উভয় হাত দুই হাঁটুর ওপর ছেড়ে রাখবে এবং কিবলামুখী হয়ে বসবে।"(প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৩৩)

এই চারজানু হয়ে বসা যোগীদের চক্রাসনের অনুরূপ। যিয়াউল কুলুবের মূল তিনটি অধ্যায়: চিশতিয়া, কাদিরিয়া ও নকশবন্দিয়া ইত্যাদি তরিকার যিকর-শোগুল ও মুরাকাবাসমূহের আলোচনায় উল্লিখিত অনুশীলনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ ধরনের শারীরিক ভঙ্গির কথা আছে। এগুলোর অধিকাংশের সঙ্গেই যোগীদের বিভিন্ন আসনের মিল পাওয়া যাবে।

কিন্তু যিয়াউল কুলুবের ডিসকোর্সে এই বিশেষ ধরনের শারীরিক অনুশীলনের ভঙ্গিগুলো আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রত্যাশী সালিকদের সফল হওয়ার পথে নিজেদের শারীরিক ও মানসিক উদাসীনতা, গাফিলতি, দুর্বলতা ইত্যাদি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রতিমুহূর্তে তেলওয়াতে ওজুদ বা দেহতত্ত্ব পর্যালোচনা হিসেবে কার্যকর-ভূমিকা পালনকারী অনুঘটক হিসেবে পাই। সালিকদের সফল হওয়ার উপায় বা পথগুলোকে হাজি ইমদাদুল্লাহ যথাক্রমে তওবা, যুহদ, তাওয়াক্কুল, কানাআত, আজলত, তাওয়াজ্জুহ, সবর, রেজা, যিকর এবং মুরাকাবা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং, হাজি ইমদাদুল্লাহর উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে যিয়াউল কুলুবের সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়ার আলাপ, তাঁর সামগ্রিক ডিসকোর্সের আংশিক চিত্রই হাজির করবে।

সুলতানুল আযকার শোগুল ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ


এখন দেখি ওপরে বিশ্লেষিত উদ্দেশ্যের দিক থেকে সুলতানুল আযকার শোগুল এবং সুলতানুল আযকার যিকর ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সম্ভাব্য কি কি উপায় বা যোগীদের বিভিন্ন অনুশীলনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিষয় অবলম্বন করেছেন এবং এসব উপায় অবলম্বন তাঁর বৃহ ওর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ-এমন কি কি ফলাফল হাজির করেছে?

শোগুল একটি আরবি শব্দ (شُغْل), যার আভিধানিক অর্থ ব্যস্ততা, সাধনা বা কোনো কাজে মগ্ন থাকা। তাজকিয়াতুন নাফসের পরিসরে, লৌকিক বা জাগতিক চিন্তাভাবনা থেকে মনকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন রাখার বিশেষ পদ্ধতি বা কৌশলকে শোগুল বলা হয়। এই শব্দটি দ্বারা মূলত রুহানি তরক্কির পর্যায়ে বিভিন্ন শারীরিক অনুশীলন বা ভঙ্গির মাধ্যমে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা সাথে মানসিক সাধনার মাধ্যমে নিজের মানসিক ও আধ্যাত্মিক দশাকে চিনতে পারার ঘটনাকে নির্দেশ করা হয়। এর মধ্যে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বসা, শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ (পাস-আনফাস) এবং নির্দিষ্ট কায়দায় চোখ বা মনোযোগ নির্দিষ্ট লতিফার (সূক্ষ্ম রূপ বা প্রকাশ) ওপর স্থির রাখা অন্তর্ভুক্ত। চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া ও কাদেরিয়া তরিকায় বিভিন্ন প্রকার শোগুল শেখানো হয়, যার মধ্যে অন্যতম সুলতানুল আযকার শোগুল।

ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কি লিখছেন, “সংকীর্ণ এবং অন্ধকার এমন একটি ক্ষুদ্র কুঠুরি নির্বাচন করবে, যেখানে বাইরের শোরগোলের আওয়াজ প্রবেশ করতে না পারে।...এরপর শুয়ে বা বসে বা দাঁড়িয়ে থেকে সম্পূর্ণ শরীর ঢিলা ও অসাড় করে রাখবে এবং নিজেকে মৃত বলে ধ্যান করবে। পরে আপাদমস্তক ধ্যানস্থ অবস্থায় শ্বাস গ্রহণের সময় اللّٰهُ (আল্লাহূ) ও শ্বাস ত্যাগের সময় هُوَ (হূ) বলার ধ্যান করবে। শ্বাস গ্রহণ ও শ্বাস ত্যাগের সময় প্রতিটি লোমকূপ হতে هُوَ যিকর হচ্ছে বলে খেয়াল করবে।...এর ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তার এমন অবস্থা হবে যে, প্রতিটি চুল এবং লোমকে সবসময় যিকর করতে দেখা যাবে এবং তার সর্বাঙ্গ আল্লাহর তাজাল্লির নূরে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে।”(প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৪৮-৪৯)

উপরে উদ্ধৃত চিশতিয়া তরিকার সুলতানুল আযকার শোগুল সম্পর্কে হাজি ইমদাদুল্লাহর ব্যাখ্যা থেকে যেসব বিষয় উঠে আসে, সেগুলো হলো:

১. পরিবেশগত শর্ত: কোলাহলমুক্ত, নির্জন, সংকীর্ণ ও অন্ধকার স্থান বা কুঠুরি।

২. শারীরিক অনুশীলন বা ভঙ্গি: শরীর ঢিলা ও অসাড় করে দেওয়া এবং নিজেকে মৃত বলে ধ্যান করা।

৩. রূপান্তরমূলক চর্চা: ক) ধ্যানস্থ অবস্থায় শ্বাস গ্রহণের সময় اللّٰهُ এবং শ্বাস ত্যাগের সময় هُوَ বলার ধ্যান করা। খ) শ্বাস গ্রহণ ও শ্বাস ত্যাগের সময় প্রতিটি লোমকূপ থেকে هُوَ যিকর হচ্ছে বলে খেয়াল করা।

৪. বৃহত্তর ফলাফল। ক) প্রতিটি চুল ও লোমকূপ থেকে সবসময় যিকর হতে থাকবে। খ) যাকির আল্লাহর তজল্লির নূরে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবেন। অর্থাৎ, সালিকের পক্ষে আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁর একান্ত ও আন্তরিক সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব হবে।উপরে প্রথম দুই পয়েন্টে আসা পরিবেশগত শর্ত ও শারীরিক অনুশীলন বা ভঙ্গি ইত্যাদিকে আমরা পতঞ্জলির যোগসূত্র (The Yoga Sutra of Patanjali A Biography, ডেভিড গর্ডন হোয়াইট, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৪) এবং আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবন আহমদ আলবিরুনীকৃত এর আরবি অভিযোজন كِتَاب بَاتَنْجَلِ الْهِنْدِي فِي الْخَلَاصِ مِنَ الْأَثْقَالِ (কিতাব বাতাঞ্জলি আল-হিন্দি ফিল খালাস মিনাল আছকাল) (The Yoga Sutras of Patañjali [সমান্তরাল আরবি-ইংরেজি টেক্সট] আবু রায়হান আল-বিরুনি, সম্পাদনা ও ইংরেজি অনুবাদ : মারিও কোজাহ, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০) প্রাসঙ্গিক অংশগুলোর সাথে মিলিয়ে পড়েছি; এছাড়া, পরবর্তীকালে হঠযোগ ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যে (হঠযোগ প্রদীপিকা, যোগী স্বাত্মারাম, সংস্কৃত টেক্সট সংকলন ও বাংলা অনুবাদ সংযোজন : মহেশচন্দ্র পাল, কলকাতা, ১৮১০ [শকাব্দ]) কীভাবে আদি ধারণাগুলো রূপান্তরিত হয়েছে, তাও পরীক্ষা করেছি; এ সামগ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিম্নলিখিত দৃশ্যপট হাজির হয়েছে :

মারিও কুজাহ-এর ইংরেজি অনুবাদে পতঞ্জলি
মারিও কুজাহ-এর ইংরেজি অনুবাদে পতঞ্জলি

উপরে প্রথম দুই পয়েন্টে আসা পরিবেশগত শর্ত ও শারীরিক অনুশীলন বা ভঙ্গি ইত্যাদিকে আমরা পতঞ্জলির যোগসূত্র (The Yoga Sutra of Patanjali A Biography, ডেভিড গর্ডন হোয়াইট, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৪) এবং আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবন আহমদ আল-বিরুনী-কৃত এর আরবি অভিযোজন كِتَاب بَاتَنْجَلِ الْهِنْدِي فِي الْخَلَاصِ مِنَ الْأَثْقَالِ (কিতাব বাতাঞ্জলি আল-হিন্দি ফিল খালাস মিনাল আছকাল) (The Yoga Sutras of Patañjali [সমান্তরাল আরবি-ইংরেজি টেক্সট] আবু রায়হান আল-বিরুনি, সম্পাদনা ও ইংরেজি অনুবাদ : মারিও কোজাহ, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০) প্রাসঙ্গিক অংশগুলোর সাথে মিলিয়ে পড়েছি; এছাড়া, পরবর্তীকালে হঠযোগ ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যে (হঠযোগ প্রদীপিকা, যোগী স্বাত্মারাম, সংস্কৃত টেক্সট সংকলন ও বাংলা অনুবাদ সংযোজন : মহেশচন্দ্র পাল, কলকাতা, ১৮১০ [শকাব্দ]) কীভাবে আদি ধারণাগুলো রূপান্তরিত হয়েছে, তাও পরীক্ষা করেছি; এ সামগ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিম্নলিখিত দৃশ্যপট হাজির হয়েছে :


নকশবন্দিয়া- মুজাদ্দেদিয়া তরিকার ওজিফাগুলোতে আল্লাহর একান্ত ও আন্তরিক সান্নিধ্য লাভের একাগ্রতা বা হুজুরে দিলকে নামাজ বা সালাতের পূর্ণ ফয়েজ ও বরকত লাভের পূর্বশর্ত বলা হয়েছে। আর হাজি ইমদাদুল্লাহ বলছেন, এভাবে হুজুরে দিলের সঙ্গে নামাজ সম্পন্ন করতে থাকলেই “আল্লাহর মদদ ও মেহেরবানিতে নামাজের হাকিকত ও মারিফতের দ্বার” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ১০২) উন্মোচিত হয়। সুতরাং, এটা পরিষ্কার যে হাজ্জি ইমদাদুল্লাহর সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়া একদিকে তাঁর এস্তেমাল করা ইসলাম-বিষয়ক বৃহত্তর ডিসকার্সিভ ঐতিহ্যের সাথে এবং অন্যদিকে প্রক্রিয়া হিসেবে, তৎকালীন ইসলামিকেট বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অঙ্গীভবন (integration) ধারণার যেসব রূপের বিকাশ ঘটেছিল সেসব রূপের সাথে সম্পর্কিত।

সুলতানুল আযকার যিকর ও কুতুবিয়ত মকাম

এখন সুলতানুল আযকার যিকরের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক! সুলতান শব্দের অর্থ রাজা বা সম্রাট এবং আযকার হলো যিকিরের বহুবচন। অতএব, সুলতানুল আযকার মানে হলো সর্বোত্তম যিকির। তজকিয়াতুন নফসের পরিসরে এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে: ক) আক্ষরিক অর্থ আল্লাহর যাতি নাম হলো আল্লাহ। এই নামের শেষাংশ বা মূল নির্যাস হলো هو (হূ)। মুরাকাবা-মুশাহাদার কোন মাকামে যখন একজন সালেক কেবল هو ধ্বনি দিয়ে যিকির করেন, তখন তাকে সুলতানুল আযকার হূ বলা হয়।

খ) আধ্যাত্মিক ও শারীরিক বা প্রয়োগিক অর্থ মানুষের সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক প্রকাশ বা লতিফা, যেমন: কলব, রূহ, সির, খফি, আখফা, নফস - যখন যিকিরের মাধ্যমে জাগ্রত হয়, তখন এর চূড়ান্ত পর্যায়ে দেহের প্রতিটি লোমকূপ, রক্তকণিকা এবং প্রতিটি কোষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আল্লাহর যিকিরে মগ্ন হয়ে পড়ে। সাধক মুখে উচ্চারণ না করলেও তার পুরো অস্তিত্ব থেকে আল্লাহর যিকির ধ্বনিত হতে থাকে। দেহের এই সর্বব্যাপী ও স্বয়ংক্রিয় যিকিরের অবস্থাকেই বলা হয় সুলতানুল আযকার।

হাজি ইমদাদুল্লাহ বলছেন, “পঞ্চেন্দ্রিয় তুলা বা আঙুলের সাহায্যে বন্ধ করে নাভির তল হতে শ্বাস টেনে উম্মুদ দিমাগ অর্থাৎ মস্তিষ্কের মধ্যে নিয়ে গিয়ে থামবে এবং সেখান থেকে দিলের মাঝে টেনে নিয়ে কলবি যিকরসহ বস্তু উপাদানে গঠিত মনের কথা শোনার সাথে উম্মুদ দিমাগ এবং দিলে মুদাওয়ারে অবস্থিত উজ্জ্বল নুকতাটিকে, অনেকে একে লতিফায়ে আখফা নামে অভিহিত করেন — পরিব্যাপ্ত যিকর। উক্ত যিকরে এমনভাবে মশগুল হয়ে থাকবে, যেন ক্রমে সেই নুকতাটি বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হতে থাকে এবং তার সমস্ত শরীরের প্রায় সর্বত্র সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এরপর আল্লাহর আরশ হতে হিন এ পৃথিবী পর্যন্ত সবকিছুই নূরে প্রজ্বল দৃষ্টিগোচর হতে থাকবে…। সালিক বা আল্লাহর অন্বেষী ব্যক্তি যদি এই স্তর ও পদ্ধতি অর্জন করতে পারে, তবে সে স্বীয় সত্ত্বাকে নিখিল বিশ্বের নিয়ন্তা বলে প্রত্যক্ষ করতে পারবে…। যাকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন, অদৃশ্যের সম্মানে বিভূষিত করে থাকেন।” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৪৯)

এখন হাজি ইমদাদুল্লাহর ব্যাখ্যাটি একটু সমালোচনামূলকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাক! এতে নিম্নের বিষয়গুলো উঠে আসে:

১. এই যিকরের পূর্বশর্ত হলো পঞ্চেন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ।

২. নিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণের সুপরিচিত যোগি কৌশল।

৩. এর সাথে লতিফায়ে আখফাকে পরিব্যাপ্ত করা।

৪. তজকিয়াতুন নফসের বিশ্বদর্শন বিবেচনায় স্বীয় সত্ত্বাকে নিখিল বিশ্বের নিয়ন্তা বা কুতুবিয়ত মকামের সাথে প্রত্যক্ষণ।

উপরের প্রথম তিনটি পয়েন্টের বিবেচনায় নিচের সারণিতে আমরা যিয়াউল কুলুব, কিতাব বাতাঞ্জলি আল-হিন্দি ফিল খালাস মিনাল আছকাল এবং হঠযোগ ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যের কাঠামোগত হদ বা সীমা নির্ণয়ের চেষ্টা করলাম:

চতুর্থ পয়েন্টটির দিক থেকে বলা যায়, তজকিয়াতুন নফসের বিশ্বদর্শনে قطب (কুতুব) অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা। এর আক্ষরিক অর্থ হলো অক্ষ, মেরু, কেন্দ্রবিন্দু বা চাকা ঘোরানোর দণ্ড (Axis / Pivot)। একটি চাকা বা ঘূর্ণায়মান গোলক তার অক্ষ বা কেন্দ্রের ওপর ভর করে ঘোরে, ঠিক তেমনি এই সমগ্র সৃষ্টিজগৎ বা মহাবিশ্ব যে মানবীয় কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে উদ্ভাসিত কেন্দ্রের ওপর ভর করে টিকে আছে, তিনিই হলেন কুতুব আর কুতুবিয়ত হলো কুতুবের আধ্যাত্মিক অবস্থা, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব বা গুণাবলী। এটি সাধারণ পদবি নির্দেশ করে না বরং আধ্যাত্মিক বিবর্তনের এমন এক চরম শিখর, যেখানে মানুষ নিজের আত্ম বা অহং সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে ইনসান-আল-কামিল বা পূর্ণাঙ্গ মানবে পরিণত হন।

এই বিশ্বদর্শনে, আল্লাহ এই পৃথিবী পরিচালনার জন্য একটি অদৃশ্য আধ্যাত্মিক সরকার বা স্তরবিন্যাস তৈরি করে রেখেছেন। এই শ্রেণিবিন্যাসের সবার উপরে থাকেন একজন মাত্র ব্যক্তি, যাকে قُطْبُ الْأَقْطَاب (কুতুবুল আকতাব / কুতুবদের কুতুব) বা الْغَوْث (আল-গাউস / উদ্ধারকর্তা বা সাহায্যকারী) বলা হয়। প্রতি যুগে বা সময়ে পৃথিবীতে মাত্র একজনই প্রধান কুতুব বা গাউস থাকেন এবং তিনি হলেন খোদার নূর, রহমত এবং মহাজাগতিক শক্তির মূল মাধ্যম । আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সমস্ত রুহানি ফয়ুজ প্রথমে কুতুবের হৃদয়ে আসে এবং তাঁর মাধ্যমে তা পুরো সৃষ্টিজগতে ছড়িয়ে পড়ে।

কুতুবিয়ত মকাম নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত:

১. মহাজাগতিক চেতনা: কুতুবের চেতনা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সমগ্র সৃষ্টিজগতের চেতনার সাথে একীভূত হয়ে যায়।

২. আকর্ষণ শক্তি: তিনি আধ্যাত্মিক জগতের এমন এক চৌম্বকীয় কেন্দ্রবিন্দু, যার দিকে অন্য সকল সূফি সাধক, যেমন: আবদাল, আওতাদ, নুয়াবা - আকর্ষিত হন এবং দিকনির্দেশনা পান।

৩. লুক্কায়িত অবয়ব: কুতুবিয়ত অর্জনকারী ব্যক্তি অনেক সময় সাধারণ মানুষের চোখে প্রকাশ্য নাও হতে পারেন। তিনি একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে সমাজের মাঝে লুকিয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর প্রভাব থাকে অসীম।

এই ডিসকোর্স নিছক দুনিয়াদারির বাইরের কোনো ঘটনা নয়। বরং প্রাক্-আধুনিক যুগে ইসলামিকেট বিশ্বে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে ঘিরে যে ডিসকোর্স গড়ে উঠেছিল, তার সাথে এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ প্রসঙ্গে আদিত্য বেহলের (২০১২, পৃষ্ঠা: ৬–৭) এই পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ:

“সুফি শেখরা প্রায়ই কোনো ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি প্রতিষ্ঠা করতেন। তাঁরা ভূমির ওপর নিজেদের ঐশী এখতিয়ারের ধারণা ব্যবহার করতেন এবং রাজাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, কোনো পবিত্র ব্যক্তির বরকতের কারণেই তাঁরা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। এই পবিত্র ব্যক্তিরা ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী, কারণ তাঁরা একই সঙ্গে দুটি জগতে বিচরণ করতেন—দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতে। তাঁরা নির্বাচিত শিষ্যদের এবং সুফি খানকায় (সুফি সাধনাকেন্দ্র, নির্জন সাধনালয় বা আশ্রয়স্থল) সমবেত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে অদৃশ্য জগতের নিদর্শনগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারতেন।

জাগতিক শাসকদের কর্তৃত্বের ঊর্ধ্বে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি নির্ধারিত স্তরবিন্যাস রয়েছে, যাঁরা বিশ্বের সকল অঞ্চলের কল্যাণের জন্য নিরন্তর সজাগ থাকেন…। খোরাসানে শেখরা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের এমন দাবি সক্রিয়ভাবে ও প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন..। চতুর্দশ শতাব্দীর এবং পরবর্তী সময়ের ভারতে…এই ধারণাটি অত্যন্ত সুপরিচিত।”

অতএব, এই ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করে দেয় যে, সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং ভূখণ্ডগত বা মহাজাগতিক কর্তৃত্বের দাবি কেবল আত্মশুদ্ধির পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তা তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে এক বিকল্প সার্বভৌমত্বের রূপ ফুটিয়ে তুলত, যা হাজি ইমদাদুল্লাহর মতো সাধকদের ডিসকোর্সে যোগীয় প্রভাব ও পরিভাষার আত্মীকরণের মাধ্যমেই আরও বেশি কার্যকর ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল।


উপসংহার

এখন আমরা বলতে পারি, সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়া একটি জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক-আধ্যাত্মিক গতিপথ হাজির করে; আমাদের বিশেষায়িত কেস স্টাডি যিয়াউল কুলুব এই প্রস্তাবনার একটি প্রামাণ্য দলিল। তাই সুফি ও যোগদর্শনের বোঝাপড়াকে নিছক ধার করা রূপকের মাধ্যমে বোঝা বেশ কঠিন। এই বোঝাপড়া যেমনই একটি বৃহত্তর তথ্যসূত্র-সংশ্লিষ্ট ডিসকার্সিভ ঐতিহ্যের অংশ, ঠিক তেমনই এর সম্পর্ক তৎকালীন ইসলামিকেট বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অঙ্গীভবন ধারণার যেসব রূপের বিকাশ ঘটেছিল সেসবের সাথে।

আরো দেখুন

ad585862-ce2d-4ff3-b4b9-047dfa5dad0d.png

তিলোপার দর্শন ও মহামুদ্রা

ad585862-ce2d-4ff3-b4b9-047dfa5dad0d.png

আল-কিন্দি: ‘প্রথম আরব দার্শনিক’

ad585862-ce2d-4ff3-b4b9-047dfa5dad0d.png

কাব্বালাহ: ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদের আদ্যোপান্ত

bottom of page